প্রত্যেক মুসলিমের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য: ইসলামের আলোকে

প্রত্যেক মুসলিমের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য: কুরআন ও হাদিসের আলোকে

বিষয়বস্তু তালিকা


ইসলাম শুধু কয়েকটি রীতিনীতি বা ইবাদতের নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক, ইবাদত, পরিবার, সমাজ, চরিত্র ও আত্মশুদ্ধি থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। একজন মুসলিমের দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতের মুক্তির জন্য তার ওপর অর্পিত মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো জানা এবং যথাযথভাবে পালন করা অত্যন্ত জরুরি। তাই কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে মুসলিমের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো, যাতে প্রত্যেক মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে পারেন।

আল্লাহ তাআলার হক আদায় করা

একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় ও প্রথম দায়িত্ব হলো আল্লাহ তাআলার হক আদায় করা। মুয়ায (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উফাইর নামক একটি গাধার পিঠে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে আরোহী ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মুয়ায, তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কি? এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কি? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হল, বান্দা তার ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হল, তাঁর ইবাদতে কাউকে শরীক না করলে আল্লাহ তাঁকে শাস্তি দিবেন না। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি লোকদের এ সুসংবাদ দিব না? তিনি বললেন, তুমি তাদের সুসংবাদটি দিও না, তাহলে লোকেরা (এর উপরই) নির্ভর করে বসবে। (সহিহ বুখারি: ২৮৫৬) । এই হকের কয়েকটি দিক নিচে আলোচনা করা হলো।

ঈমান ও সঠিক আকীদা

প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তাআলার প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা এবং ইসলামের মৌলিক আকীদা সঠিকভাবে জানা ও বিশ্বাস করা জরুরি। সঠিক আকীদাই একজন মুসলিমের বিশ্বাস, ইবাদত ও জীবনযাপনের ভিত্তি।  আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

একদা আল্লাহর রসূল (ﷺ) জনসমক্ষে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় তাঁর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘ঈমান কি?’

তিনি বললেনঃ ‘ঈমান হল, আপনি বিশ্বাস রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, (পুনরুত্থানের দিন) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি।’

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলাম কি?’

তিনি বললেনঃ ‘ইসলাম হল, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ যাকাত আদায় করবেন এবং রমাদানের সিয়ামব্রত পালন করবেন।’

ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কি?’

তিনি বললেনঃ ‘আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।’

ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেয়ামত কবে?’

তিনি বললেনঃ ‘এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন। তবে আমি আপনাকে কেয়ামতের আলামতসমূহ বলে দিচ্ছি: বাঁদী যখন তার প্রভুকে প্রসব করবে এবং উটের নগণ্য রাখালেরা যখন বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে।

(কেয়ামতের জ্ঞান) সেই পাঁচটি জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।’ অতঃপর আল্লাহর রসূল (ﷺ) এই আয়াতটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেনঃ ‘কেয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই নিকট…….।’ (সূরা লুকমান:৩৪)

এরপর ঐ ব্যক্তি চলে গেলে তিনি বললেনঃ ‘তোমরা তাকে ফিরিয়ে আন।’ তারা কিছুই দেখতে পেল না। তখন তিনি বললেন, ‘ইনি জিবরীল (আঃ); লোকদেরকে তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।’

সঠিক আকীদা শুধু কিছু বিষয় বিশ্বাস করার নাম নয়; এটি একজন মুসলিমের চিন্তা, ইবাদত ও জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস মানুষকে তাঁর ওপর ভরসা করতে, তাঁর আদেশ মেনে চলতে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস তাকে নিজের কাজের জবাবদিহিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। একইভাবে তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস বিপদে ধৈর্য ধরতে এবং নিয়ামতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে শেখায়। 

শিরক থেকে মুক্ত থেকে তাওহীদের উপর দৃঢ় থাকা এবং ভ্রান্ত আকীদা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য, কারণ শিরক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় জুলুম (সূরা লুকমান, ৩১:১৩)।

ইবাদত করা

আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জ্বিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, “আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধু এজন্য যে, তারা আমার ইবাদত করবে” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)। ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ (কালিমা, সালাত, সাওম, হজ এবং যাকাত ), যা হাদিসে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে (সহিহ বুখারি: ৮)। মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করার মাধ্যমে সফলতা অর্জন করা  । তাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু নিজের ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে অন্যদের কাছেও আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া। 

নামাজ

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং দ্বীনের খুঁটি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, আমি কি সমস্ত কাজের মূল, স্তম্ভ ও সর্বোচ্চ শিখর সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করবো না? আমি (মু’আয ইবনু জাবাল রাযিঃ) বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ সকল কাজের মূল হলো ইসলাম, স্তম্ভ হলো নামায এবং সর্বোচ্চ শিখর হলো জিহাদ। (তিরমিজি: ২৬১৬)  আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর।” (সূরা বাকারা: ৪৩)। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে জামাতের সাথে আদায় করা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। বান্দা এবং শিরক-কুফরের মধ্যে পার্থক্য সালাত পরিত্যাগ করা। (সহিহ মুসলিম: ৮২)। সুতরাং, যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দিল, সে কুফরি করল। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের নামাজগুলো কবুল করুন। আমিন। 

রোজা

রমজান মাসের রোজা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ফরজ। রোজার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা। রোজা একজন মুসলিমকে আত্মসংযম, ধৈর্য ও আল্লাহভীতি অর্জনে সাহায্য করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংযত রাখতে শেখায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৮৩) 

যাকাত

যাকাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ফরজ দায়িত্ব। যাকাত সম্পদকে পবিত্র করে, মানুষের অন্তরকে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখে। তাই যাদের ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে, তাদের উচিত সঠিকভাবে হিসাব করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যাকাত আদায় করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত প্রদান কর এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর।” (সূরা বাকারা: ৪৩)

যাকাত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী মুসলিমের ওপর ফরজ। যার কাছে নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং তা শরিয়ত নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তার মালিকানায় থাকে, তার ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ হয়। 

হজ

সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। আল্লাহ বলেন, “তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)

যারা সামর্থ্যের অভাবে হজ পালন করতে পারছেন না, তারা হতাশ হবেন না। হজের ফরজ আদায় করার বিকল্প কোনো আমল নেই, তবে কিছু নেক আমলের জন্য হজের সমপরিমাণ সওয়াদের কথা হাদিসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের সালাত আদায় করে, এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে থাকে, তারপর দুই রাকাত সালাত আদায় করে, তার জন্য পূর্ণ হজ ও উমরার সওয়াব রয়েছে, পূর্ণ, পূর্ণ, পূর্ণ।” (তিরমিজি: ৫৮৬)

আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা

শুধু ইবাদত পালনই যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলা এবং যা নিষেধ করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকাও ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে ধন-সম্পদ আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে নিয়ে তাঁর রসূলকে দিলেন তা আল্লাহর জন্য তাঁর রসূলের জন্য আর রসূলের আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও পথিকদের জন্য যাতে তা তোমাদের মধ্যকার সম্পদশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যাত্থেকে নিষেধ করে তাত্থেকে বিরত থাক, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।” (সূরা হাশর: ৭)

আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর নির্দেশনা আমাদের জীবনের অসংখ্য বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ ও জীবন থেকে এসব নির্দেশনা কীভাবে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা যায়, তা জানতে পড়ুন আমাদের বিস্তারিত আর্টিকেল: ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে মহানবী সাঃ এর কিছু আদর্শ

হারাম বর্জন করা এবং হালাল গ্রহণ করা 

জীবিকা উপার্জনে হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলা একজন মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মানুষ, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু।” (সূরা বাকারা: ১৬৮)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সাথে থাকবেন (তিরমিযি: ১২০৯)

সুদ, ঘুষ, প্রতারণা ও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। একইসঙ্গে হালাল উপায়ে উপার্জন করা এবং পবিত্র ও বৈধ খাদ্য গ্রহণ করাও জরুরি। হারাম উপার্জন মানুষের জীবনে বরকত নষ্ট করে এবং দোয়া কবুলের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করে। (সহিহ মুসলিম: ১০১৫) 

দ্বীনি জ্ঞান অর্জন

দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছাড়া সঠিকভাবে ইবাদত ও জীবনযাপন সম্ভব নয়। দ্বীনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকলে মানুষ অজ্ঞতার কারণে ভুল আকীদা গ্রহণ করতে, ভুলভাবে ইবাদত করতে এবং হারাম কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। ধীরে ধীরে এই অজ্ঞতা তাকে এমন বিশ্বাস ও কাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ।  রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য।” (ইবনে মাজাহ: ২২৪)

তাই আমাদের উচিত  কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও আকীদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা যাতে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ শরিয়তসম্মতভাবে করা যায়।

মানুষের হক আদায় করা

আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হক আদায় করাও ইসলামে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর হক সংক্রান্ত কোনো ত্রুটির জন্য তওবা ও সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়। আল্লাহ চাইলে বান্দার সেই ভুল মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু কোনো বান্দার হক নষ্ট করলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। যার হক নষ্ট করা হয়েছে, তার প্রাপ্য হক ফিরিয়ে দেওয়া এবং সম্ভব হলে তার কাছ থেকে মৃত্যুর আগেই ক্ষমা চাওয়াও জরুরি।কেননা কিয়ামতের দিন মানুষের হক নষ্ট করার হিসাব নেক আমলের মাধ্যমে দিতে হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “সে-ই মুসলিম, যার জিহবা ও হাত হতে সকল মুসলিম নিরাপদ এবং সে-ই প্রকৃত মুহাজির, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা যে ত্যাগ করে।” (সহিহ বুখারি: ১০)। পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সাধারণ মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করা, কারো প্রতি জুলুম না করা এবং আমানত রক্ষা করা একজন মুসলিমের অপরিহার্য দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, 

“কিয়ামতের দিন প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তি সে নয়, যার দুনিয়ায় সম্পদ নেই; বরং সে ব্যক্তি, যে নামাজ, রোজা ও যাকাতসহ বহু নেক আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু মানুষের ওপর জুলুম করেছে, গালি দিয়েছে, অপমান করেছে, সম্পদ আত্মসাৎ করেছে বা অন্যের অধিকার নষ্ট করেছে। তখন তার নেক আমলগুলো মজলুমদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)

অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া

একজন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু নিজে ইসলাম মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামর্থ্য ও জ্ঞান অনুযায়ী অন্যদের কাছেও ইসলামের সত্য বার্তা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে অমুসলিমদের কাছে তাওহিদ ও ইসলামের পরিচয় তুলে ধরা একটি মহান দাওয়াতি কাজ। এটি নবী-রাসূলদের আদর্শ, যারা মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছেন। তাই হিকমাহ, সুন্দর ভাষা, ধৈর্য ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে অমুসলিমদের ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনার একটি সুন্দর কথা, একটি সঠিক তথ্য বা উত্তম আচরণ হয়তো কারও হৃদয়ে ইসলামের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না। (সহিহ মুসলিম: ২৬৭৪) 

আল্লাহ তাআলা বলেন, “জ্ঞান-বুদ্ধি আর উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তুমি (মানুষকে) তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান জানাও আর লোকেদের সাথে বিতর্ক কর এমন পন্থায় যা অতি উত্তম। তোমার প্রতিপালক ভালভাবেই জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে গুমরাহ হয়ে গেছে। আর কে সঠিক পথে আছে তাও তিনি বেশি জানেন।” (সূরা নাহল:১২৫)। প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে অমুসলিমদের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া উম্মতের সামষ্টিক দায়িত্ব।

সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা (আমর বিল মারুফ, নাহি আনিল মুনকার)

একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজে সৎকাজ করা এবং সামর্থ্য ও জ্ঞান অনুযায়ী অন্যদেরও সৎকাজে উৎসাহিত করা ও অসৎকাজ থেকে সতর্ক করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আলে ইমরান:১০৪)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যায় দেখলে হাত দিয়ে প্রতিরোধ করবে, সামর্থ্য না থাকলে মুখে, তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করবে, আর এটাই ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক।  (সহিহ মুসলিম: ৪৯)

একটি বাস্তব উদাহরণ হলো, ধরুন, আপনার কোনো বন্ধু যদি নিয়মিত নামাজ ছেড়ে দেয়, তাকে কঠোরভাবে অপমান না করে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নামাজের গুরুত্ব বোঝানো। প্রয়োজনে তার সঙ্গে মসজিদে যাওয়া এবং নিয়মিত নামাজের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহযোগিতা করাও সৎ কাজে উৎসাহ দেওয়ার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।

আপনার একটি আন্তরিক কথা হয়তো তার জীবনে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আর সে যদি সেই ভালো কাজের ওপর অটল থাকে, তাহলে তার আমলের সওয়াবের অনুরূপ সওয়াবের সুসংবাদও হাদিসে এসেছে।

সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা

পরিবার একটি সমাজের ভিত্তি, তাই পরিবারকে সঠিক দ্বীনি শিক্ষায় গড়ে তোলা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতা। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তাই করে, তাদেরকে যা করার জন্য আদেশ দেয়া হয়।” (সূরা তাহরিম:৬)

পাশাপাশি দরিদ্র, এতিম, বিধবা, অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা একজন মুসলিমের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, আশ্রয় বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষের উপকার করা যায়। মানুষের কল্যাণে দান-সদকা করা এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো সদকায়ে জারিয়ারও মাধ্যম হতে পারে। আপনি চাইলে আল-আনকাবূত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচালিত মানবসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারেন। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, নিজেদের ও পরিজনদের আগুন থেকে রক্ষা কর” (সূরা তাহরিম:৬)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম” (তিরমিযি)। এছাড়া প্রতিবেশীর হক, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাও একজন মুসলিমের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আখিরাতের প্রস্তুতি

মানুষ স্বভাবতই ভুল ও গুনাহের শিকার হতে পারে। তাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজের ভুল উপলব্ধি করে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করা।

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। নামাজ, রোজা, যাকাত, সদকা, কুরআন তিলাওয়াত, মানুষের হক আদায় এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত আত্মসমালোচনা করে নিজের গুনাহ ও ত্রুটিগুলো সংশোধন করা এবং মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখা একজন মুমিনকে সঠিক পথে অটল থাকতে সাহায্য করে। নিজেকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করা উচিত:

“আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো, তাহলে আমি কি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত? প্রত্যেক মুসলিমের উচিত এই প্রশ্নকে নিজের জীবনের পরিবর্তনের কারণ বানানো।

”আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের জন্য কি প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। ” (সূরা হাশর: ১৮)

সর্বশেষ বার্তা  

একজন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু মসজিদে গিয়ে ইবাদত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ঈমান, ইবাদত, উপার্জন, চরিত্র, পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ এবং অন্য মানুষের প্রতি আচরণ সবকিছুর মধ্যেই ইসলামের শিক্ষা প্রতিফলিত হওয়া উচিত। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের দায়িত্বগুলো জানা, সেগুলো পালনের চেষ্টা করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক ঈমান, সহিহ জ্ঞান, কবুলযোগ্য আমল এবং তাঁর বান্দাদের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আরও পড়ুন

সওয়াবের নিয়তে পোস্টটি শেয়ার করুন

নগদ/বিকাশ পার্সোনাল 01700000000
ব্যাংক AC : 4567890-567890