মৃত্যুর আগে আমাদের করণীয় কী? – আখিরাতের জন্য করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও নেক কাজ

মৃত্যুর আগে আমাদের করণীয় কী, আখিরাতের প্রস্তুতি, ইসলামিক জীবন নির্দেশনা, তওবা, নামাজ, সদকা, কুরআন, নেক আমল ও একজন মুমিনের মৃত্যুর আগে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিষয়সমূহ নিয়ে ইসলামিক ছবি।

বিষয়বস্তু তালিকা

মৃত্যু এমন একটি সত্য, যা কেউ এড়াতে পারে না। আজ না হোক কাল, আমাদের প্রত্যেককেই এই পথে যেতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই দিনের জন্য প্রস্তুত? আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “প্রতিটি জীবন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণমাত্রায় বিনিময় দেয়া হবে। যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল, কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)

এই আয়াত আমাদের সুস্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী, আর প্রকৃত সফলতা কেবল আখিরাতেই। তাই একজন সচেতন মুমিন দুনিয়ার মোহে আবদ্ধ না হয়ে আখিরাতের প্রস্তুতিকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

এই নির্দেশিকাটি সেই সকল মুসলিম ভাই ও বোনদের জন্য, যারা আন্তরিকভাবে আখিরাতের সফলতার প্রস্তুতি নিতে চান। ইসলামের আলোকে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও করণীয় এখানে তুলে ধরা হয়েছে, যা একজন মুমিনের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করবে। ছোট ছোট নেক আমল থেকেই শুরু হোক আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের যাত্রা। 

আন্তরিক তওবা করা

মানুষ পৃথিবীতে যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, একদিন তাকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় গুনাহকে হালকা মনে করি এবং তওবাকে পরে করার জন্য ফেলে রাখি। অথচ কেউ জানে না তার মৃত্যু কখন এসে যাবে। তাই মৃত্যুর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ইখলাসের সাথে তওবা করা এবং নিজের ঈমানকে শক্ত রাখা। কারণ ঈমান দুর্বল হলে মানুষ সহজে গুনাহের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “নিশ্চয়ই যারা অজ্ঞতাবশতঃ মন্দ কাজ ক’রে বসে, তৎপর সত্বর তাওবাহ করে, এরাই তারা যাদের তাওবাহ আল্লাহ কবূল করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞানী।” (সূরা নিসা: ১৭)। ইসলামে তওবা মানে শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়। বরং নিজের গুনাহের জন্য অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া, সেই পাপ কাজ ত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে আর সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা। একজন বান্দা যখন সত্যিকারভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন এবং অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেন।

অনেক মানুষ মনে করে, “আরও একটু পরে ভালো হয়ে যাব”, “বৃদ্ধ হলে তওবা করব” অথবা “এখন জীবন উপভোগ করি, পরে দ্বীনের পথে আসব।” কিন্তু মৃত্যু কখনো কাউকে সময় দিয়ে আসে না। কত মানুষ সকালে সুস্থ ছিল, সন্ধ্যার আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। তাই একজন বুদ্ধিমান মুসলিম সেই ব্যক্তি, যে দেরি না করে সবসময় আল্লাহর স্মরণ করে এবং তাওবা করে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করা

ইমানের পর নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি সম্পর্কের প্রকাশ। একজন মুসলিম যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, তখন তিনি প্রতিদিন বারবার আল্লাহর সামনে উপস্থিত হন এবং নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। যদি (নিয়মিতভাবে) ঠিকমত নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে তবে সে নাজাত পাবে এবং সফলকাম হবে। যদি নামাজ নষ্ট হয়ে থাকে তবে সে ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত হবে।” (জামে তিরমিজি: ৪১৩) [সংক্ষেপিত]

নিয়মিত নামাজ মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে, অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে এবং আল্লাহভীতি বৃদ্ধি করে। অনেক সময় ব্যস্ততা, অলসতা কিংবা গাফিলতির কারণে নামাজ ছুটে যেতে পারে। কিন্তু একজন সচেতন মুমিনের কাজ হলো দ্রুত কাজা আদায় করা এবং ভবিষ্যতে আরও যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ”আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি আছে তা হল নামায। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দেয়, সে কুফুরী কাজ করে।” (সুনান আত-তিরমিজি: ২৬২১)

আমাদের প্রতিটি নামাজ এমনভাবে আদায় করা উচিত, যেন এটি জীবনের শেষ নামাজ। মৃত্যুর পর যখন আমলনামা খোলা হবে, তখন যেন নামাজের পৃষ্ঠা শূন্য না থাকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানোই একজন মুসলিমের আখিরাতের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

মানুষের হক আদায় করা

ইসলামে শুধু আল্লাহর ইবাদতই যথেষ্ট নয়, মানুষের হকও ঠিকভাবে আদায় করতে হয়। আল্লাহ তাআলা দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি চাইলে নিজের হক ক্ষমা করে দিতে পারেন। যদি বান্দা আন্তরিকভাবে তওবা করে, ভুল স্বীকার করে এবং তাঁর দিকে ফিরে আসে। কিন্তু মানুষের হক ততক্ষণ মাফ হয় না, যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি নিজে ক্ষমা করে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত, মানুষের সঙ্গে আচরণে সতর্ক থাকা। এর মধ্যে কয়েকটি কাজ হলো-

  • কারো কাছে ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা।
  • কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া।
  • কারো গীবত বা অপবাদ দিয়ে থাকলে তাওবা করা।
  • ভাঙা সম্পর্ক থাকলে অহংকার ছেড়ে আগে এগিয়ে গিয়ে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করা।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ”তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে?” তারা বললেন, ”আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক।” তখন তিনি বললেন, ”আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হাক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)

মৃত্যুর আগে মানুষের হক পরিষ্কার করে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আখিরাতে মানুষের হকই অনেকের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আজই নিজের সম্পর্ক, লেনদেন ও আচরণ নিয়ে ভাবা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারও হক নষ্ট করা উচিত নয়। ভুল করেও কারও হক নষ্ট করে থাকলে দ্রুত তা আদায় করা প্রয়োজন। এতে আল্লাহ তায়ালাও খুশি হন।

কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা

পবিত্র কুরআন আল্লাহ তাআলার মহান কালাম। এটি শুধু তিলাওয়াতের জন্য অবতীর্ণ কোনো কিতাব নয়, বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। একজন মুমিন যখন কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তখন তার অন্তর প্রশান্ত হয়, ঈমান মজবুত হয় এবং জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়। কুরআন মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও আমলকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে সাহায্য করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরআনের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন,

“তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে শাফা’আতকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সূরাহ অর্থাৎ সূরাহ আল বাকারাহ এবং সূরাহ্ আ-লি ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরাহ এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরাহ আল বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না।” (সহিহ মুসলিম: ৮০৪)

এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কুরআনের সাথে সম্পর্ক শুধু দুনিয়াবি উপকারের জন্য নয়, বরং আখিরাতের সফলতার সাথেও গভীরভাবে জড়িত। যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করে এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করে, সে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও হিদায়াত লাভ করে। তাই প্রতিদিন ব্যস্ততার মাঝেও কুরআনের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা উচিত। অল্প হলেও নিয়মিত তিলাওয়াত করা, আয়াতের অর্থ ও তাফসির বোঝার চেষ্টা করা এবং কুরআনের শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা একজন মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ এই কুরআনই দুনিয়ায় পথপ্রদর্শক এবং মৃত্যুর পর কবরের অন্ধকারে নূরের উৎস হবে, ইনশাআল্লাহ।

হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা

মৃত্যুর আগে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হলো নিজের উপার্জনকে হালাল ও পবিত্র রাখা। কারণ একজন মানুষের রিজিক, খাদ্য ও জীবনযাপন তার আমল এবং আখিরাতের অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই মৃত্যুর আগে নিজের আয়ের উৎস যাচাই করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এটি ইবাদত কবুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একজন মানুষের আয় ও খাদ্য যদি হালাল না হয়, তবে তার ইবাদতের প্রভাব ও বরকত কমে যায়। তাই মুমিনের জন্য উপার্জনের উৎস পরিষ্কার ও শরিয়তসম্মত রাখা অপরিহার্য। হালাল উপার্জন মানুষের জীবনে শান্তি আনে এবং আখিরাতের জন্য নিরাপত্তা তৈরি করে আল্লাহ তায়ালা লেছেন, “হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র ও ভাল বস্ত্ত থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর সে সর্ম্পকে আমি সম্যক জ্ঞাত।” (সূরা আল মু’মিনূন: ৫১) । এইখানে আল্লাহ তাঁর নবী-রাসুলদের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে আমাদেরকেও সেই বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

একজন মুমিনের উচিত নিজের আয়ের উৎস নিয়মিতভাবে যাচাই করা। কোনো সন্দেহজনক বা অনিশ্চিত আয় থাকলে তা পরিহার করা এবং হালাল পথে উপার্জনের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। যদিও হালাল আয় তুলনামূলক কম মনে হতে পারে, এতে বরকত ও শান্তি থাকে। অন্যদিকে হারাম আয় বেশি হলেও তাতে বরকতের অভাব থাকে এবং তা আখিরাতে ক্ষতির কারণ হয়।

বেশি বেশি সদকা ও সাদাকায়ে জারিয়া করা

মৃত্যুর আগে এমন আমল বৃদ্ধি করা উচিত, যা আখিরাতে নাজাতের কারণ হবে। সদকা ও সাদাকায়ে জারিয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি, যা গুনাহ মাফের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর পরেও বান্দার জন্য অবিরাম সওয়াব পৌঁছাতে থাকে। সদকা দুনিয়ার বিপদ-আপদ দূর করে এবং আখিরাতে আমলনামাকে ভারী করে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ব্যয় করে, তাদের (দানের) তুলনা সেই বীজের মত, যাত্থেকে সাতটি শীষ জন্মিল, প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন, বর্ধিত হারে দিয়ে থাকেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, জ্ঞানময়।” (সূরা বাকারা:২৬১)

আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদ কখনো কমে না, বরং তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং বান্দার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। সাদাকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত এমন কিছু আমল রয়েছে, যা মানুষের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখে। যেমন মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করা, এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান করা, পানির কষ্ট দূর করতে কূপ বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, ফলদায়ক গাছ রোপণ করা এবং দ্বীনি জ্ঞান মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া। এসব কাজের প্রভাব ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে এবং তার আমলনামায় ধারাবাহিকভাবে সওয়াব যুক্ত হতে থাকে।

মৃত্যুকে স্মরণ করা – কিন্তু হতাশ হবেন না

মৃত্যু মানুষের জীবনের একটি অবশ্যম্ভাবী সত্য। ইসলামে মৃত্যুর স্মরণকে ভয়ের উৎস হিসেবে নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও সঠিক পথে ফিরে আসার একটি মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর কথা মনে হলে মানুষ গুনাহ থেকে দূরে থাকে, আমলের প্রতি মনোযোগ বাড়ে এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমে যায়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা বেশি পরিমাণে জীবনের স্বাদ হরণকারীর অর্থাৎ মৃত্যুর স্মরণ কর।” (তিরমিজি: ২৩০৭)

তবে মৃত্যুর স্মরণ হতাশার কারণ নয়। ইসলাম কখনোই মানুষকে নিরাশ হতে শেখায় না। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি অসীম দয়ালু এবং ক্ষমাশীল। তিনি বলেন, “বল- হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”
(সূরা আয-যুমার:৫৩)

তাই একজন মুমিন কখনো হতাশ হয় না। সে মৃত্যুকে স্মরণ করার মাধ্যমে গুনাহ থেকে ফিরে আসবে, আমল বৃদ্ধি করবে এবং একই সাথে আল্লাহর রহমতের উপর পূর্ণ ভরসা রাখবে।

পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করা

ইসলামে ব্যক্তিগত সংশোধনের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য। একজন মুমিন শুধু নিজের ইবাদত ও আমল ঠিক রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করার দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়। পরিবার একটি মানুষের প্রথম শিক্ষা কেন্দ্র, যেখানে চরিত্র, বিশ্বাস এবং আমলের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতা। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তাই করে, তাদেরকে যা করার জন্য আদেশ দেয়া হয়।” (সূরা আত-তাহরীম: ৬)

একজন মুসলিমের উচিত তার সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নামাজের শিক্ষা দেওয়া, কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং হালাল ও হারামের পার্থক্য বোঝানো। পরিবারের মধ্যে ইসলামী পরিবেশ তৈরি করা, সুন্দর আচরণ ও নৈতিকতার বাস্তব উদাহরণ নিজে হয়ে দেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একটি পরিবার দ্বীনের পথে পরিচালিত হয়, তখন সেই পরিবারের সন্তানদের নেক আমল ও দোয়া মৃত্যুর পরেও একজন মানুষের জন্য সদকায়ে জারিয়ার মতো কল্যাণ বয়ে আনে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ”যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা ২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে। (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)

নেক সঙ্গ গ্রহণ করা

মানুষের চরিত্র, চিন্তাভাবনা ও জীবনধারার ওপর সঙ্গের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একজন ব্যক্তি যাদের সাথে চলাফেরা করে, ধীরে ধীরে তাদের আচরণ ও অভ্যাস তার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। এ কারণেই ইসলাম নেককার ও দ্বীনদার মানুষের সঙ্গ গ্রহণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। যারা আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দেয়, ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করে এবং ভালো কাজের দিকে পরিচালিত করে, তাদের সান্নিধ্য ঈমানকে মজবুত করে এবং আখিরাতমুখী জীবন গঠনে সহায়তা করে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।” (আবু দাউদ: ৪৮৩৩)

তাই একজন মুমিনের উচিত এমন সঙ্গ বেছে নেওয়া, যারা তাকে আল্লাহর স্মরণে রাখে এবং সঠিক পথে চলতে সহায়তা করে। যারা গুনাহের দিকে উৎসাহ দেয় বা আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, তাদের সঙ্গ থেকে দূরে থাকা জরুরি। নেক সঙ্গ একজন মানুষকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সঠিক পথে রাখে এবং আখিরাতের সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ”সৎসঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হল, কস্তুরীওয়ালা ও কামারের হাপরের ন্যায়। কস্তুরীওয়ালা হয়ত তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার নিকট হতে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার নিকট হতে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার নিকট হতে পাবে দুর্গন্ধ।” (সহীহ বুখারী: ৫৫৩৪)

প্রতিদিন ছোট ছোট ভালো আমল করা

ইসলামে আমলের মূল্য নির্ধারিত হয় শুধু বড় কাজ দিয়ে নয়, বরং ধারাবাহিকতা দিয়েও। ছোট হলেও নিয়মিত নেক আমল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। একজন মুমিন যখন প্রতিদিন অল্প অল্প করে নেক কাজ করতে থাকে, তখন তা তার আমলনামায় বড় সঞ্চয়ে পরিণত হয় এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমরা ঠিকভাবে নিষ্ঠাসহ কাজ করে নৈকট্য লাভ কর। জেনে রেখ, তোমাদের কাউকে তার ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাবে না এবং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ’আমল হলো, যা সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয় যদিও তা অল্প হয়।” (সহীহ বুখারী: ৬৪৬৪)

ধারাবাহিকতা হলো আমলের মূল সৌন্দর্য। বড় বড় পরিকল্পনার চেয়ে ছোট কিন্তু নিয়মিত কাজ বেশি মূল্যবান। এ বিষয়ে কিছু হাদিসও পাওয়া যায় যা ধারাবাহিক নেক আমলের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। তাই একজন মুমিনের উচিত প্রতিদিন কিছু সহজ নেক কাজ অভ্যাসে আনা। সকালে ও সন্ধ্যায় যিকির করা, অন্যকে সালাম দেওয়া, সুন্দরভাবে কথা বলা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলা এবং সামান্য হলেও কাউকে সাহায্য করা। এই ছোট ছোট আমলগুলো নিয়মিত করলে তা আখিরাতে বড় নেকির ভান্ডার তৈরি করে এবং জীবনকে বরকতময় করে তোলে।

উপসংহার

মৃত্যু দুনিয়ার সমাপ্তি হলেও আখিরাতের জীবনের সূচনা। আর সেই অনন্ত জীবনের সফলতা নির্ভর করে এই দুনিয়ায় আমাদের ঈমান, আমল ও আল্লাহর আনুগত্যের ওপর। তাই একজন মুমিনের উচিত মৃত্যুর আগেই নিজের জীবনকে নেক আমল, তওবা ও তাকওয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা। এখনই সময় আল্লাহর দিকে ফিরে আসার। নিয়মিত নামাজ আদায় করা, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা, মানুষের হক আদায় করা, সদকা ও সাদাকায়ে জারিয়ায় অংশ নেওয়া এবং পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

গুনাহ যত বড়ই হোক, আন্তরিক তওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমলের তাওফিক দান করুন, হুসনুল খাতিমা (ঈমানের সাথে সুন্দর বা উত্তম মৃত্যু) নসিব করুন এবং আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমিন।

সওয়াবের নিয়তে পোস্টটি শেয়ার করুন

নগদ/বিকাশ পার্সোনাল 01700000000
ব্যাংক AC : 4567890-567890