কুরবানি শুধু একটি পশু জবাই নয়। এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আঃ)-কে আল্লাহর নির্দেশে কুরবানি দিতে রাজি হয়েছিলেন। আল্লাহ সেই ত্যাগ কবুল করেছিলেন এবং পশু দিয়ে তা পূরণ করে দিয়েছিলেন। সেই মহান ঘটনার স্মরণে প্রতি বছর জিলহজ মাসে সারা বিশ্বের মুসলিমরা কুরবানি দেন। কুরআনে বর্ণিত রয়েছে,
“আল্লাহর কাছে ওগুলোর (কুরবানীর) না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, কাজেই সৎকর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। ” (সূরা হজ্জ : ৩৭)
এই একটি আয়াত পুরো কুরবানির আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট বুঝা যায় । পশু জবাই করা এখানে মূল বিষয় নয়, বরং আপনার নিয়ত, তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পশুটি শুধু একটি মাধ্যম। লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং নিজের ভেতরে তাকওয়া গড়ে তোলা।
এই গাইডে কুরবানির প্রতিটি বিষয় কুরআন, হাদীস ও ফিকহের রেফারেন্স সহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিটি বিষয় ধাপে ধাপে বোঝানো হয়েছে, যাতে আপনি নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কোন কাজটি ওয়াজিব, কোনটি সুন্নাহ, আর কোনটি এড়িয়ে চলতে হবে।
কুরবানি কী এবং এর ইতিহাস
কুরবানি (قرباني) শব্দটি আরবি ‘কুরব’ (قرب) থেকে এসেছে, যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, ত্যাগ বা উৎসর্গ। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গ করা। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
“অতএব তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ো এবং কুরবানি করো।” (সূরা কাউসার : ২)
এই আয়াতে নামাজ ও কুরবানিকে পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে কুরবানি শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি আল্লাহর সন্তুষ্টির একটি বিশেষ ইবাদত।
ইসলামে কুরবানির বিধান এসেছে হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর মহান ত্যাগের ঘটনা থেকে। পবিত্র কুরআনে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) -এর ঘটনার মাধ্যমে কুরবানির এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। যখন ইসমাইল (আঃ) তাঁর পিতার সাথে চলাফেরা করার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছালেন, তখন ইবরাহীম (আঃ) তাঁকে বললেন, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন যে তিনি তাঁকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি করছেন। এ কথা শুনে ইসমাইল (আঃ) ধৈর্য ও আনুগত্যের সাথে বললেন, “হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
এরপর দু’জনেই সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর আদেশের প্রতি আত্মসমর্পণ করলেন। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয় পুত্রকে কুরবানির জন্য শুইয়ে দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাঁকে আহ্বান করে জানালেন যে, তিনি স্বপ্নের নির্দেশ সত্যে পরিণত করেছেন। আল্লাহ বলেন, এভাবেই তিনি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দেন এবং এটি ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এক মহান কুরবানির বিনিময়ে ইসমাইল (আঃ)-কে মুক্ত করে দেন।(সূরা আস-সাফফাতে : ১০২-১০৭)
কুরবানির হুকুম কি? ওয়াজিব না সুন্নত?
কুরবানির বিধান নিয়ে আলেমদের দুটি মত আছে। একদল আলেম যেমন ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আওযায়ী ও ইমাম লাইস বলেন কুরবানি ওয়াজিব। ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকেও এ মতের একটি বর্ণনা আছে। অন্যদিকে অধিকাংশ আলেমের মত হলো, কুরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, যা ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী-এর প্রসিদ্ধ মত। তবে এই মত অনুযায়ীও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করা মাকরূহ। কারণ কুরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, তাই সমাজে এটি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
যারা কুরবানি ওয়াজিব বলেন তাদের দলিল:
১। আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন,”কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর এবং কুরবানী কর।” (সূরা কাউছার : ২)। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন ওয়াজিব।
২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ”যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।”(সুনান ইবনে মাজাহ : ৩১২৩)। যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্ক-বাণী। তাই কুরবানি ওয়াজিব।
আর যারা কুরবানি দেওয়া সুন্নত বলেন তাদের দলিল হচ্ছে:
১। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ”তোমাদের মাঝে যে কুরবানি করতে চায়, যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানি সম্পন্ন করার আগে তার কোনো চুল ও নখ না কাটে।” দলিল। এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘যে কুরবানি করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়।
২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানি করেনি তাদের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন। তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে কুরবানি ওয়াজিব নয়। দলিল
কুরবানির পশু: কোনটি বৈধ, কোনটি নয়?
বৈধ পশু ও বয়সের শর্ত
কুরবানিতে শুধু নির্ধারিত পশু দেওয়া যায়। যেকোনো পশু জবাই করলে কুরবানি আদায় হয় না।
ছাগল: ন্যূনতম এক বছর বয়স হতে হবে। দলিল
ভেড়া বা দুম্বা: ন্যূনতম ছয় মাস বয়স হলে চলে, তবে শর্ত হলো দেখতে এক বছরের মতো মনে হতে হবে। দলিল
গরু ও মহিষ: গরু ও মহিষ কুরবানির ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত এসেছে ফিকহি ইজমা ও সাহাবা-তাবেঈনের আমল থেকে, সরাসরি সহিহ হাদিসে সংখ্যা আকারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। গরু ও মহিষ কুরবানির ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত এসেছে ফিকহি ইজমা ও সাহাবা-তাবেঈনের আমল থেকে, সরাসরি সহিহ হাদিসে সংখ্যা আকারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। সানিয়্যাহ” (পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক পশু) গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে অর্থ হলো দুই বছর পূর্ণ হওয়া।
উট: উটের ক্ষেত্রে কুরবানির জন্য ন্যূনতম বয়স “সানিয়্যাহ” ধরা হয়েছে। “সানিয়্যাহ” মানে পূর্ণ দাঁত উঠা প্রাপ্তবয়স্ক উট। আরব ভাষায় উটের ক্ষেত্রে এই পর্যায় সাধারণত ৫ বছর পূর্ণ হলে হয়। • তাই ফকিহরা একমত হয়েছেন, উট কুরবানির জন্য কমপক্ষে ৫ বছর হতে হবে। সরাসরি “৫ বছর” সংখ্যা হিসেবে সহিহ হাদিসে উল্লেখ নেই।
এটি এসেছে হাদিসের শব্দ ব্যাখ্যা, ভাষাগত অর্থ এবং সাহাবা যুগের আমল থেকে।
বি. দ্র. : বাজার থেকে পশু কেনার সময় বিক্রেতাকে বয়স জিজ্ঞেস করুন। অনেক সময় পশু দেখতে বড় মনে হলেও বয়স কম থাকে। যদি নিশ্চিত না হতে পারেন, তাহলে একটু বেশি বয়সের পশু কিনুন। কারণ বয়সের শর্ত পূরণ না হলে কুরবানি শুদ্ধ হবে না।
যে পশু কুরবানি করা যাবে না
ইসলামের এই বিধান গুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জন্য উত্তম ও নিখুঁত জিনিস উৎসর্গ করা। ত্রুটিপূর্ণ পশু দিয়ে কুরবানি মানে আল্লাহর জন্য দ্বিতীয় শ্রেণীর জিনিস বেছে নেওয়া, এটি তাকওয়া ও আন্তরিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চার ধরনের পশু কুরবানি দিতে নিষেধ করেছেন। এগুলো হলোঃ স্পষ্টভাবে অন্ধ পশু, স্পষ্টভাবে রোগাক্রান্ত পশু, স্পষ্টভাবে খোঁড়া পশু যে চলতে পারে না, এবং অতিরিক্ত দুর্বল পশু যার হাড়ে মজ্জা নেই। দলিল
এছাড়া যে পশুর কান অর্ধেকের বেশি কাটা, যার কান ছিদ্র করা হয়েছে, শিং গোড়া থেকে ভাঙা, বা লেজ কাটা, সেটিও কুরবানির অযোগ্য। দলিল১ দলিল২
একা না ভাগে কুরবানি?
এটি নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। বিশেষত গরুতে কতজন ভাগ দিতে পারবেন, বা ছাগলে কি শুধু একজনের নাম হবে, এই প্রশ্নগুলো প্রায়ই ওঠে।
ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে
একটি ছাগল বা ভেড়া একজনের পক্ষ থেকে কুরবানি হয়। তবে এই একজনের কুরবানিতে পুরো পরিবারও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে একজন ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানি করতেন এবং তা থেকে নিজেরাও খেতেন, অন্যদেরও খাওয়াতেন। পরে মানুষের মধ্যে কুরবানিকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা দেয়। দলিল
এর মানে হলো, পরিবারের প্রধান একটি ছাগল কুরবানি দিলে তাঁর স্ত্রী, সন্তান সবার পক্ষ থেকে কুরবানি আদায় হয়ে যায়। আলাদাভাবে প্রতিজনের জন্য আলাদা পশু লাগে না। এর ফলে সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষেরাও আল্লাহ তায়ালার সন্তুস্তির জন্য কুরবানি আদায় করতে পারে।
গরু ও উটের ক্ষেত্রে
একটি গরু বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন ভাগ দিতে পারবেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে সাতজনের পক্ষ থেকে একটি গরু এবং একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করার বিধান রয়েছে। দলিল
উটের ক্ষেত্রেকিছু বর্ণনায় দশজনের কথাও এসেছে। দলিল
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি ভাগীদারের নিয়ত হতে হবে কুরবানির। যদি কেউ শুধু মাংসের জন্য ভাগ নেন, কুরবানির নিয়তে না, তাহলে কুরবানি নষ্ট হয়ে যাবে বলে অনেক ফকিহ মত দিয়েছেন। এছাড়াও হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে, প্রতিটি কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। দলিল
কুরবানির সময়: কখন শুরু, কখন শেষ?
এই বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আর প্রত্যেকটা ইবাদত নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করতে হয়। যেমন নামায, রমজানের রজা, হাজ্জ এবং যাকাত। কুরবানিরও একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। ভুল সময়ে যবেহ করলে কুরবানি আদায় হয় না।
কখন শুরু?
১০ জিলহজ, ঈদের নামাজের পর এবং খুতবা শেষ হওয়ার পর কুরবানি যবেহ শুরু করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের খুতবায় বলেছেন, এই দিনের কাজ শুরু হবে ঈদের নামাজ দিয়ে। এরপর মানুষ বাড়ি ফিরে কুরবানি করবে। যে ব্যক্তি এই নিয়ম অনুসরণ করবে, সে সুন্নাহ মেনে চলবে। আর যে ব্যক্তি নামাজের আগে কুরবানি করে, তার কুরবানি সহীহ হবে না, তা শুধু মাংস হিসেবে গণ্য হবে। দলিল
এই হাদীস থেকে স্পষ্ট যে নামাজের আগে কুরবানি করলে কুরবানি হয় না, শুধু মাংস হয়। অনেকেই তাড়াহুড়ো করে সকাল সকাল যবেহ করে ফেলেন। এটি সম্পূর্ণ ভুল।
কখন শেষ?
কুরবানির সময় শুরু হয় ১০ জিলহজ ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পর থেকে। ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করলে তা কুরবানি হিসেবে গণ্য হয় না। কুরবানির শেষ সময় নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহের মতে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। অর্থাৎ ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ, এই তিন দিন কুরবানি বৈধ।
অন্যদিকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং অনেক মুহাদ্দিস ও ফকিহের মতে তাশরীকের সব দিনই (১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ্জ) কুরবানির সময়। সে হিসেবে ১৩ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কুরবানি করা বৈধ। এই মতকে অনেক সমসাময়িক আলেমও শক্তিশালী বলেছেন।
তাই উত্তম হলো ১০ জিলহজেই দ্রুত কুরবানি সম্পন্ন করা। তবে প্রয়োজন হলে ১১, ১২ এবং শক্তিশালী মত অনুযায়ী ১৩ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কুরবানি করা যাবে।
যবেহর সম্পূর্ণ নিয়ম ও পদ্ধতি
নিজে যবেহ করবেন নাকি অন্যকে দেবেন?
যে ব্যক্তি ভালোভাবে যবেহ করতে পারেন, তাঁর নিজে করাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সবসময় নিজে কুরবানি যবেহ করেছেন। দলিল১ দলিল ২
তবে অন্যকে দায়িত্ব দেওয়াও সম্পূর্ণ বৈধ। বিদায় হজে রাসূল (সাঃ) ৬৩টি উট নিজে যবেহ করেন, বাকিগুলো আলী (রাঃ)-কে দায়িত্ব দেন। দলিল
মহিলারাও নিজে যবেহ করতে পারবেন। যবেহের জন্য পুরুষ হওয়া শর্ত নয়। তবে যবেহকারীকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। কাফের, মুশরিক বা বেনামাজির হাতে যবেহ করালে কুরবানি হবে না। দলিল
পশুর প্রতি দয়া দেখানো ইসলামের নির্দেশ
অনেকে মনে করেন পশু জবাই করতে হবে তাই দয়ার প্রশ্ন নেই। এটি ভুল ধারণা। ইসলাম যবেহের সময়ও পশুর প্রতি দয়া দেখাতে বলেছে। অবশ্যই আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর অনুগ্রহ লিপিবদ্ধ করেছেন। সুতরাং যবেহ করার সময় তখন উত্তমরূপে অনুগ্রহের সাথে যবেহ করা উচিত। যবেহের ছুরিকে ধারালো করা উচিত, যেন পশুটি আরাম পায়।” দলিল১ দলিল ২
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, যবেহের আগে ছুরি ভালোভাবে ধারালো করতে হবে যাতে পশু কম কষ্ট পায়। ভোঁতা ছুরি দিয়ে যবেহ করলে পশু বেশি কষ্ট পায়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। পশুর সামনে ছুরি শান দেওয়া মাকরূহ। এতে পশু ভয় পায়। একটি পশুকে অন্যটির সামনে যবেহ করা মাকরূহ। পশুকে টেনে হিঁচড়ে যবেহস্থলে নিয়ে যাওয়া মাকরূহ। প্রাণ ত্যাগের আগে চামড়া ছাড়ানো, ঘাড় মটকানো বা পায়ের শিরা কাটা হারাম। দলিল১ দলিল ২
পশুর অবস্থান কেমন হবে?
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী উট যবেহ বা নহর করার সুন্নাহ পদ্ধতি হলো সেটিকে দাঁড় করিয়ে রাখা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যিয়াদ ইবনু জুবাইর (রহ.) এক ব্যক্তিকে বসে থাকা অবস্থায় উট নহর করতে দেখে বাধা দেন এবং ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে জানান যে, উটকে দাঁড় করিয়ে এবং এর পা বেঁধে নহর করাই হলো বিশ্বনবী মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রকৃত সুন্নাহ। এমনকি পবিত্র কুরআনের ‘সওয়াফ’ শব্দের ব্যাখ্যায় ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) দাঁড়িয়ে কুরবানি করার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। এই পদ্ধতিটি পশুর প্রতি দয়া এবং সুন্নাহর অনুসরণের একটি অনন্য নিদর্শন। দলিল১ দলিল২
যবেহের সময় কোন দোয়া পড়বেন?
বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব। আল্লাহ বলেছেন,
“কাজেই যে পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তা তোমরা খাও যদি তাঁর নিদর্শনাবলীতে তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাক।” (সূরা আনআম : ১১৮)
“যাতে (যবহ করার সময়) আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তা তোমরা মোটেই খাবে না, তা হচ্ছে পাপাচার, শায়ত্বনেরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সঙ্গে তর্ক-ঝগড়া করার জন্য প্ররোচিত করে; যদি তোমরা তাদের কথা মান্য করে চল তাহলে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে।” (সূরা আনআম : ১২১)
কুরবানির পশু সামনে রেখে রাসুল (সা.) এই দোয়া পরতেন- “ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল-আযদা হানীফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়ায়া ও মামাতী লিল্লাহি রব্বিল আলামীন। লা শারীকা লাহু ওয়া বিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা আওওয়ালুল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা আন মুহাম্মাদিন ওয়া উম্মাতিহি।” দলিল
অর্থ: আমি একনষ্ঠিভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’’ (সূরা আনআমঃ ৭৯)। ’’বলো, আমার নামায, আমার ইবাদত (কুরবানী), আমার জীবন, আমার মৃত্যু বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরীক নাই এবং আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমপর্ণকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম’
রাসুল (সা.) ’বিস্মিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার’ পড়ে তাঁর নিজ হাতে কুরবানি করেছেন। দলিল
৭. কুরবানির মাংস বণ্টনের বিধান
এটি পুরো কুরবানি গাইডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ কুরবানির মূল উদ্দেশ্যের একটি বড় অংশ হলো গরীবের সাথে ভাগ করে নেওয়া। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের, পরিবার এবং সমাজের অভাবী মানুষের হক আদায় করে। তাই মাংস বণ্টন কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়, এটি একটি ইবাদত, যেখানে দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি এবং ন্যায়বিচার একসাথে প্রতিফলিত হয়।
বণ্টনের বিষয়ে কুরআনে বর্ণিত রয়েছে,
“যাতে তারা তাদের জন্য (এখানে রাখা দুনিয়া ও আখিরাতের) কল্যাণগুলো প্রত্যক্ষ করতে পারে আর তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক দান করেছেন, নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। কাজেই তোমরা (নিজেরা) তাত্থেকে খাও আর দুঃস্থ অভাবীদের খাওয়াও। ” (সূরা হজ্জ : ২৮)
আল্লাহ এখানে দুটি কাজ করতে বলেছেন, নিজে খাওয়া এবং গরীবকে খাওয়ানো। “অভাবগ্রস্ত গরীব” বলতে সেই গরীবকে বোঝানো হয়েছে যে নিজে থেকে চায় না, কিন্তু প্রয়োজন আছে।
“আর (কুরবানীর) উটগুলোকে আমি করেছি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ আছে, কাজেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অবস্থায় ওগুলোর উপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। যখন তা পার্শ্বভরে পড়ে যায়, তখন তাথেকে খাও আর যারা (ভিক্ষে না ক’রে) পরিতৃপ্ত থাকে তাদেরকে আর যারা কাকুতি মিনতি ক’রে যাচ্ঞা করে তাদেরকেও খাওয়াও। এভাবে আমি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (সূরা হজ্জ ২২:৩৬)
এই আয়াতে তিন ধরনের মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে। নিজে খাওয়া, যে গরীব নিজে চায় না তাকে খাওয়ানো, এবং যে গরীব সাহায্য চায় তাকে খাওয়ানো। এটি স্পষ্ট করে যে গরীবের হক কুরবানির মাংসে আছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরবানির মাংস খাওয়া , সংরক্ষণ করা এবং সাদাকাহ করতে বলেছেন। দলিল
তিন ভাগে বণ্টন: কোথা থেকে এলো?
উপর্যুক্ত আয়াত বা হাদীসে খাওয়া, হাদিয়া দেওয়া ও দান করার কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ বিবৃত হয়নি। এটি সুন্নাহ ভিত্তিক নির্দেশনা না, বরং ফিকহি মুস্তাহাব রীতি। অধিকাংশ উলামাগণ মনে করেন যে, সমস্ত মাংসকে তিন ভাগ করে এক ভাগ খাওয়া, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া দেওয়া এবং এক ভাগ গরীবদেরকে দান করা উত্তম।
কেউ চাইলে সে তার কুরবানীর গোস্তকে সমস্ত বিতরণ করে দিতে পারে। আর তা করলে উক্ত আয়াতের বিরোধিতা হবে না। কারণ, ঐ আয়াতে নিজে খাওয়ার আদেশ হল মুস্তাহাব বা সুন্নত। সে যুগের মুশরিকরা তাদের কুরবানীর মাংস খেত না বলে মহান আল্লাহ উক্ত আদেশ দিয়ে মুসলিমদেরকে তা খাবার অনুমতি দিয়েছেন। অবশ্য কেউ কেউ খাওয়া ওয়াজিবও বলেছেন। সুতরাং কিছু খাওয়াই হল উত্তম।
বি. দ্র. : যদি কেউ সব মাংস গরীবদের দিয়ে দেন, তাও বৈধ। আবার সব মাংস নিজে রাখলে কি হবে? এটি সরাসরি ফরজ বিধানকে লঙ্ঘন করা। কারণ কুরআন স্পষ্টভাবে গরীবকে খাওয়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
কসাইয়ের মজুরি এবং চামড়ার বিধান
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কসাইয়ের মজুরি দিতে নিষেধ করেছেন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে তার মজুরি পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। দলিল। কসাইকে নগদ টাকায় মজুরি দিতে হবে। মাংস দিয়ে পারিশ্রমিক পরিশোধ করলে সেটি মাংস বিক্রির সমতুল্য হয়ে যায়, যা নিষিদ্ধ। তবে পরে স্বতন্ত্রভাবে উপহার হিসেবে মাংস দিতে চাইলে দেওয়া যাবে।
কুরবানির চামড়া নিয়েও স্পষ্ট বিধান আছে। চামড়া বিক্রি করা যাবে না। তবে নিজে ব্যবহার করা যাবে, যেমন জায়নামাজ, পাপোশ বা থলে বানানো। এছাড়া চামড়া দান করা যাবে। দলিল। অনেক মাদরাসা বা এতিমখানা কুরবানির চামড়া সংগ্রহ করে। এদের দেওয়া সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে নিশ্চিত হোন যে সংস্থাটি বিশ্বস্ত এবং টাকা সঠিক কাজে ব্যবহার করে।
কুরবানির মাংস কতদিন সংরক্ষণ করা যাবে?
এই বিষয়ে একটি ব্যাপক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন তিনদিনের বেশি কুরবানির মাংস রাখা নিষিদ্ধ। এটি সঠিক নয়। ইসলামের শুরুর দিকে সত্যিই তিনদিনের বেশি মাংস রাখা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এর পেছনে একটি বিশেষ কারণ ছিল।
সালামাহ ইবনু আকওয়া (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘’রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, সে যেন ঈদের তৃতীয় রাতের পর তার বাড়িতে কুরবানীর পশুর কোন কিছু সঞ্চিত না রাখে। আগামী বছর যখন আগত হলো, তখন লোকজনেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি গত বছরের মতো করবো? তিনি বললেন, না। সে বছর তো মানুষ খুব দুর্দশায় ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম যাতে সকলের কাছে কুরবানীর (মাংস) পৌছে যায়।’’ দলিল
পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরবানির মাংস খাওয়ার, সংরক্ষণ করার এবং, সাদাকাহ করতে বলেছেন ।” দলিল
এই হাদীস দুটো থেকে স্পষ্ট যে, তিনদিনের নিষেধাজ্ঞা একটি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য ছিল এবং পরে তা রদ হয়ে গেছে। এখন কুরবানির মাংস যতদিন খুশি সংরক্ষণ করা যাবে। তবে অভাবের এলাকায় থাকলে যত বেশি বিতরণ করা যায়, ততই উত্তম।
কুরবানির দিনের ফজিলত
কুরবানির দিন, অর্থাৎ ১০ জিলহজ, ইসলামে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিনগুলোর একটি। এই দিনকে হাদিসে “ইয়াওমুল হজ্জিল আকবর” বা শ্রেষ্ঠ হজের দিন বলা হয়েছে।
১। ইবনু ’উমার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (যিলহাজের দশ তারিখ) নহরের দিন তিনটি জামরার মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ এটি কোন্ দিন? লোকেরা বললো, আজ কুরবানীর দিন। তিনি বললেন, আজ হজের (হজ্জের) বড় দিন। (আবু দাউদ : ১৯৪৫)
২। আইশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরবানীর দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচাইতে পছন্দনীয় হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানী করা)। কিয়ামতের দিন তা নিজের শিং, পশম ও ক্ষুরসহ হাযির হবে। তার (কুরবানীর পশুর) রক্ত যমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে এক বিশেষ মর্যাদায় পৌছে যায়। অতএব তোমরা আনন্দিত মনে কুরবানী কর। (তিরমিজি : ১৪৯৩)
৩। উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের মুসলিম জনগণের ঈদের দিন হচ্ছে আরাফার দিন, কুরবানীর দিন ও তাশরীকের দিন। এ দিনগুলো হচ্ছে পানাহারের দিন। (তিরমিজি : ৭৭৩)
তাশরীকের দিনসমূহ: ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ
১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজকে ‘আইয়ামে তাশরীক’ বলা হয়। কুরবানির মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য এই দিনগুলোতে রোদে শুকানো হতো বলেই এই নামকরণ হয়েছে।
এই তিনটি দিন ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা নিজেই এই দিনগুলোতে তাঁর জিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (তাশরীক) আল্লাহকে স্মরণ করবে; অতঃপর যে ব্যক্তি তাড়াতাড়ি ক’রে দু’দিনে চলে যায় তার প্রতি কোন গুনাহ নেই এবং যে ব্যক্তি অধিক সময় পর্যন্ত বিলম্ব করবে, তার প্রতিও গুনাহ নেই, এটা তার জন্য যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করবে এবং আল্লাহ্কে ভয় করতে থাকবে এবং জেনে রেখ, তোমরা সকলেই তাঁরই দিকে একত্রিত হবে।“ (সূরা বাকারাহ : ২০৩)
তাশরীকের দিনগুলো পানাহার ও আল্লাহর জিকিরের দিন। এই দিনগুলোতে আনন্দ করা, আত্মীয়দের সাথে সময় কাটানো এবং ভালো খাবার গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে অপচয় থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, “আর তিনি (আল্লাহ) যিনি লতাগুল্ম বিশিষ্ট আর লতা-বিশিষ্ট নয় এমন উদ্যানরাজি, খেজুর গাছ ও বিভিন্ন স্বাদের খাদ্যশস্য, একই ধরনের ও আলাদা ধরনের যায়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন। যখন ফল ধরে তখন ফল খাও, আর ফসল তোলার দিন (নির্ধারিত ওশর ও অনির্ধারিত দানের মাধ্যমে) হক আদায় কর, অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।“ (সূরা আন’আম : ১৪১)
এই দিনগুলো ঈদ হওয়ার কারণে রোজা রাখা নিষিদ্ধ। ইবনে উমর (রা.) ও আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, কুরবানি দিতে অক্ষম এমন ব্যক্তি ছাড়া আর কারো জন্য তাশরীকের দিনগুলোতে রোজা রাখার অনুমতি নেই। দলিল । আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘’আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাজ্জ ও ‘উমরাহকে পূর্ণ কর, কিন্তু যদি তোমরা বাধাগ্রস্ত হও, তবে যা সম্ভব কুরবানী দিবে এবং কুরবানী যথাস্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত নিজেদের মস্তক মুন্ডন করো না, তবে তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত কিংবা মাথায় যন্ত্রণাগ্রস্ত, সে রোযা কিংবা সদাক্বাহ বা কুরবানী দ্বারা ফিদইয়া দিবে এবং যখন তোমরা নিরাপদ থাক, তখন যে কেউ ‘উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে ইচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এই মোট দশদিন রোযা পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মাসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। আল্লাহকে ভয় কর আর জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।’’ (সূরা বাকারাহ : ১৯৬)
শেষ কথা
কুরবানি শুধু একটি পশু জবাইয়ের নাম নয়। এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মসমর্পণের এক মহান নিদর্শন। কুরবানির মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের আশা করে। একইসাথে এটি আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, অসহায় ও অভাবী মানুষের হক আদায় করা এবং সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ আপনার মাংস দেখেন না, রক্ত দেখেন না। তিনি দেখেন আপনার নিয়ত। তিনি দেখেন আপনার তাকওয়া।
“আল্লাহর কাছে ওগুলোর না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, কাজেই সৎকর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।” (সূরা হজ্জ : ৩৭)
কুরবানি করুন শুদ্ধ নিয়তে। সঠিক পদ্ধতিতে। গরীবের হক দিয়ে। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন। আরো পড়ুন