তাওহীদ: জীবনে শান্তি ও সফলতা পাওয়ার বাস্তব পথ

তাওহীদ একত্ববাদ ইসলামিক কনসেপ্ট শান্তি ও সফলতার পথ

আমাদের এই ব্যস্ত পৃথিবীতে আমরা সবাই কোনো না কোনো কিছুর পেছনে ছুটছি। কেউ পদের পেছনে, কেউ অর্থের পেছনে, আবার কেউ একটু মানসিক শান্তির খোঁজে। অথচ আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই যে অন্তহীন দৌড়ঝাঁপ, এর শেষ কোথায়? আমাদের জীবনের এই শূন্যতা আর অস্থিরতা দূর করার একমাত্র চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে একটি শব্দের গভীরে, আর তা হলো ‘তাওহীদ’। আমরা অনেকেই মনে করি তাওহীদ মানে শুধু স্রষ্টাকে এক মানা, আর মুখে কেবল’আল্লাহ এক’ বলা। কিন্তু আসলে তাওহীদ হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন, যা একজন মানুষকে দুনিয়ার সব হীনম্মন্যতা আর মানসিক দাসত্ব থেকে বাঁচিয়ে এক প্রশান্ত জীবনের পথ দেখায় এবং তাকে জীবনে প্রকৃত সফলতায় উন্নীত করে। কারণ যার সাথে সবকিছুর মালিক আছেন, তার চেয়ে বড় সফল আর কেউ নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “প্রতিটি জীবন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণমাত্রায় বিনিময় দেয়া হবে। যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল, কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।”(সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাওহীদ তিন প্রকার। যথা: ১. রুবূবিয়া ২. তাওহীদুল উলূহিয়া ৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস্‌ সিফাত।

তাওহীদুল উলূহিয়া: সৃষ্টি করা, রিজিক দান করা, বৃষ্টি বর্ষণ, জীবন দান, মৃত্যু দান ইত্যাদি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক মনে করাকে তাওহীদে রুবূবিয়া বলা হয়।

তাওহীদুল উলূহিয়া: নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, দু’আ, মানত ইত্যাদি বান্দার যত প্রকার ইবাদত-বন্দেগী হতে পারে সবকিছুর একমাত্র অধিকারী আল্লাহকে মনে করাকে তাওহীদে উলূহিয়া বলা হয়।

তাওহীদুল আসমা ওয়াস্‌ সিফাত: আল্লাহ তা’আলা নিজে কুরআনে অথবা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিসে আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে যে সব কথা বলেছেন সেগুলো মনে প্রাণে মেনে নেয়া। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর কোন গুণকে অস্বীকার করা যাবে না বা তাতে কোন শব্দগত বা অর্থগত বিকৃতি সাধন করা যাবে না। কিংবা সেগুলোর কোন ধরণ বা আকৃতি কল্পনা করা যাবেনা। বরং এ বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, এ সমস্ত গুণাবলী অবশ্যই সত্য কিন্তু তা মহান আল্লাহর জন্য যেমন হওয়া উচিৎ তেমনই।

তাওহীদ হলো একটি বিশ্বাস, যা আমাদের বলে যে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক এবং উপাস্য কেবল একজনই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, তোমাদের উপাস্য হচ্ছেন এক আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন উপাস্য নেই। তিনি পরম করুনাময়, অতি দয়ালু। (সূরা বাকারা: ১৬৩)। আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তিই হলো তাঁর একত্ববাদ। যখন একজন মানুষের অন্তরে এই বিশ্বাসটি গেঁথে যায়, তখন তার পুরো পৃথিবী দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।

একজন মানুষের জীবনে তাওহীদের প্রথম ও প্রধান প্রভাব হলো তার মন-মস্তিষ্ক থেকে ভ্রান্ত উপাস্য বা কুসংস্কার দূর করে একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রতি নিখাদ আনুগত্য ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে মানুষ কুফর ও শিরক থেকে মুক্ত হয়ে আত্মিক শান্তি, প্রকৃত স্বাধীনতা এবং আত্মবিশ্বাস লাভ করে। আমরা সারাক্ষণ কত কিছুকে ভয় পাই – চাকরি হারানোর ভয়, মানুষের সমালোচনার ভয়, অভাবের ভয় কিংবা ভবিষ্যতে কী হবে সেই চিন্তা। কিন্তু যখন কারো হৃদয়ে তাওহীদ শক্তভাবে গেঁথে যায়, তখন সে বুঝতে পারে যে দুনিয়ার কোনো মানুষ বা কোনো পরিস্থিতি তাকে কিছুই করতে পারবে না, যদি না তার স্রষ্টা তা চান। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কোন এক সময় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে ছিলাম।” তিনি বললেনঃ “হে তরুণ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- তুমি আল্লাহ্ তা’আলার (বিধি-নিষেধের) রক্ষা করবে, আল্লাহ তা’আলা তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহ্ তা’আলাকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহ তা’আলার নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহ্ তা’আলার নিকটেই কর। আর জেনে রাখো, যদি সকল উন্মাতও তোমার কোন উপকারের উদ্দেশে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তা’আলা তোমার জন্যে লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সকল ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ্ তা’আলা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে।”(সুনানে তিরমিযী: ২৫১৬)। 

আজকের এই যুগে আমরা অনেকেই নিজেদের  অনেক আধুনিক মনে করি। কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখা যায় আমরা আসলে নতুন ধরণের ‘শিরক’ বা মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পরছি। সেই মূর্তিগুলো হয়তো মাটি বা পাথরের নয়, বরং সেগুলো হলো আমাদের নফস বা কুপ্রবৃত্তি। আগে মানুষ মাটির বা পাথরের মূর্তি পূজা করত, এখন আমরা নিজের নফস, ট্রেন্ড, ফ্যাশন আর মানুষের কথাকে বেশি গুরুত্ব দিই। যার ফলে আমরা সমাজের তথাকথিত এই নিয়মের দাসে পরিণত হয়ে পরছি। আমরা নিজের দিকেই তাকাই। কত সময় এমন হয়, আমরা কিছু করছি শুধু মানুষ কী বলবে এই চিন্তায়? অথবা ট্রেন্ড চলছে বলে সেটাই অনুসরণ করছি, যদিও ভেতর থেকে মানতে পারছি না। তাওহীদ আপনাকে এই জায়গা থেকে বের করে আনে। এটি আপনাকে শেখায়, আপনার জীবন মানুষের সন্তুষ্টির জন্য নয়। আপনি এক আল্লাহর বান্দা, এবং আপনার জীবনের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। 

যখন আপনি এটি সত্যিকারভাবে বুঝবেন, তখন আপনার ভেতরে এক ধরনের দৃঢ়তা তৈরি হবে। আপনি আর নিজেকে ছোট ভাববেন না। কারণ আপনি জানেন, আপনি সরাসরি সেই সত্তার সাথে যুক্ত, যিনি সর্বশক্তিমান এবং পরম দয়ালু। তখন মানুষ কী বললো বা কে কী ভাবলো, এসব আর আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আপনি নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকতে পারবেন এবং আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করতে পারবেন। কারণ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্য। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,  আমি জ্বিন ও মানবকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র এ কারণে যে, তারা আমারই ‘ইবাদাত করবে। (সূরা যারিয়াত:৫৬)

আমাদের চারপাশে আমরা প্রায়ই জাত-পাত, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ কিংবা আভিজাত্যের লড়াই দেখি। যা সরাসরি তাওহীদের চেতনার পরিপন্থী বা বিপরীত। তাওহীদের মূল কথা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’—অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। এর মানে হলো সমস্ত মানুষ একমাত্র আল্লাহর গোলাম। যখন কেউ বংশ বা জাতের বড়াই করে অন্যকে নিচু মনে করে, তখন সে পরোক্ষভাবে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করে, যা মূলত অহংকার। আর অহংকার কেবল আল্লাহর চাদর। অহংকার এমন একটি জিনিস, যা আল্লাহ সরাসরি অপছন্দ করেন। তিনি বারবার সতর্ক করেছেন, অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত অপমানের দিকে ঠেলে দেয়। এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,“এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ জানেন যা তারা গোপন করে আর যা প্রকাশ করে, তিনি অহংকারীদেরকে ভালবাসেন না।” (সূরা নাহল:২৩)। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষে মানুষে সমতা আর মানবতার কথা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “হে লোকসকল! জেনে রেখো, তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রেখো, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং আরবের ওপরও অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর সাদার এবং সাদার ওপর কালোরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি তাকওয়া। আমি কি তোমাদের কাছে পৌঁছিয়েছি? উপস্থিত সাহাবারা বলেন, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল পৌঁছিয়েছেন।”(মুসনাদে আহমাদ : ২৩৪৮৯)। সামাজিক এই সাম্যই একটি সুন্দর সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। অন্যদিকে আমাদের সমাজের যুবকেরাও একটি সুন্দর সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে। এক্ষেত্রে  বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তাওহীদ আমাদের শেখায় মানুষের সেবা করতে, কারণ আমরা জানি মাখলুকের সেবা করলে খালেক(আল্লাহ) খুশি হন। আমাদের দয়া, দান আর পরোপকার তখন আর লোকদেখানো থাকে না, তা হয়ে ওঠে স্রষ্টাকে(আল্লাহ) পাওয়ার একটি মাধ্যম।

তাওহীদ শুধুমাত্র  আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজেও এর প্রতিফলন থাকা চাই। আমরা যখন ব্যবসায় সততা বজায় রাখি, যখন কেউ না দেখলেও কোনো অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকি (শুধুমাত্র এক আল্লাহকে রাজি-খুশী করানোর জন্য), এটাই হলো তাওহীদের বাস্তব প্রমাণ। আমরা জানি যে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলেও একজন দেখার মতো সত্তা সবসময় আছেন। আমাদের অন্তরে এই অনুভূতিই আমাদেরকে পবিত্র চরিত্রে উন্নত করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন- ‘আমালের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি (একদিকে যেমন) মহা শক্তিধর, (আবার অন্যদিকে) অতি ক্ষমাশীল।(সূরা মুলক: ০২)। অর্থাৎ আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজই এক একটি পরীক্ষা।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাওহীদ কি শুধু আখেরাতের জন্য? আসলে বিষয়টা এমন না। তাওহীদ আমাদের শেখায় প্রতিকূল সময়ে ধৈর্য ধরতে এবং সুসময়ে বিনয়ী হয়ে কৃতজ্ঞ থাকতে। যখন কোনো বিপদ আসে, একজন তাওহীদ পন্থী   মানুষ ভেঙে পড়ে না। সে জানে, এই বিপদটি তার রবের পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা এবং এর সমাধানও তাঁর কাছেই আছে।  কারণ সে জানে যে, রাতের অন্ধকারের পরেই ভোরের আলো ফোটে।

পরিশেষে, তাওহীদ হলো সেই আলো, যা ঘোর অন্ধকারের ভেতর আমাদের জীবনের সঠিক পথ দেখায়। এটি কেবল একটি আকিদা নয়, এটি একজন মুমিনের জীবনের স্পন্দন। আমরা যদি আমাদের জীবনকে অর্থবহ করতে চাই এবং অন্তরে সত্যিকারের প্রশান্তি পেতে চাই, তবে তাওহীদকে আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে নিতে হবে। আমাদের চিন্তা, আমাদের কাজ আর আমাদের স্বপ্ন- সবই হোক সেই এক মহান সত্তার সন্তুষ্টির জন্য। যখন আমরা পুরোপুরি আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শিখব, তখন দুনিয়ার কোনো শক্তি আমাদের পরাজিত করতে পারবে না। আসুন, আমরা আমাদের জীবনকে তাওহীদের আলোয় আলোকিত করি এবং নিজেকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করে কেবল আল্লাহর গোলাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি। তবেই আমরা দুনিয়াতে পাবো প্রকৃত সম্মান আর আখেরাতে পাবো চিরস্থায়ী জান্নাত, যার নিম্নে নদী প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল থাকবে আর রয়েছে পবিত্র সঙ্গী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি, বস্তুতঃ আল্লাহ বান্দাগণের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে তাওহীদ এর উপর অটল রাখুন এবং সেই চিরস্থায়ী জান্নাত দান করুন। আমিন। আরও পড়ুন