মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয়- “আমি তো আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করছি, তবুও কেন বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছি?” এই প্রশ্নটি প্রায় প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে কোনো না কোনো সময় উঁকি দেয়। দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা কিংবা অপ্রত্যাশিত বিপদের মুহূর্তে মানুষ ভাবতে শুরু করে- আল্লাহ কি আমাকে ভুলে গেছেন? নাকি আমার কোনো ভুলের কারণেই এই কষ্ট?

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা যাকে ভালোবাসেন, তাকেই তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করেন। এই পরীক্ষাগুলো কোনো শাস্তি নয়; বরং বান্দাকে গড়ে তোলার, তার ঈমানকে দৃঢ় করার এবং তাকে আল্লাহর আরও নৈকট্যে পৌঁছে দেওয়ার একটি মহান পদ্ধতি। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের এমন পথে পরিচালিত করেন, যেখানে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও বিশ্বাসের মাধ্যমে তারা আত্মিকভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষের সত্যিকারের ঈমান প্রকাশ পায় এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

এই লেখায় আমরা আলোচনা করবো-

আল্লাহ কেন বান্দাকে পরীক্ষা করেন?

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এই দুনিয়ায় উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। বরং প্রতিটি মানুষের জীবনই এক একটি পরীক্ষা।

১. ঈমান যাচাই করা: আল্লাহ মানুষকে সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করেন, যাতে বোঝা যায় সে সত্যিই আল্লাহর ওপর ভরসা করে কি না। বিপদের সময় কেউ ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আবার সুখের সময় কৃতজ্ঞ থাকে এই দুটোই প্রকৃত ঈমানের পরিচয় বহন করে।

২. গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা: মানুষ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নানা ভুল করে। আল্লাহ অনেক সময় কষ্ট, রোগ, দুঃখ বা বিপদের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। একই সঙ্গে এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার মর্যাদা এমন স্তরে উন্নীত করেন, যা শুধু আমলের মাধ্যমে অর্জন করা কঠিন।

৩. আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠন: পরীক্ষা মানুষের ভেতরের দুর্বলতা, অহংকার ও গাফিলতি দূর করে। যেমন আগুনে সোনা খাঁটি হয়, তেমনি দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে একজন মুমিন আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ হয় এবং তার চরিত্র আরও দৃঢ় ও সুন্দর হয়ে ওঠে।

৪. ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেওয়া: আল্লাহ চান তাঁর বান্দা দুঃখের সময় ধৈর্য ধরুক এবং সুখের সময় কৃতজ্ঞ থাকুক। এই দুই গুণ একজন প্রকৃত মুমিনের মূল বৈশিষ্ট্য। জীবনের ওঠানামার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেন।

৫. জান্নাতের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা: দুনিয়ার পরীক্ষাগুলো মূলত পরকালের প্রস্তুতি। আল্লাহ বান্দাকে বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মানসিক, আত্মিক ও ঈমানি দিক থেকে পরিপূর্ণ করেন, যাতে সে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদার যোগ্য হতে পারে।

৬. আল্লাহর ভালোবাসা ও রহমতের প্রকাশ:  আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদেরকেই তিনি বেশি পরীক্ষা করেন। কারণ এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তওবা করে এবং তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় নেয়। এটি কোনো শাস্তি নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন- ‘আমালের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি (একদিকে যেমন) মহা শক্তিধর, (আবার অন্যদিকে) অতি ক্ষমাশীল।” (সূরা আল-মুলক: ২)

মানুষের সৃষ্টি কেবল ভোগ-বিলাসের জন্য নয়; বরং আল্লাহর ইবাদত ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য। তাই প্রত্যেক মুমিনকেই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।

এই পরীক্ষাগুলো কখনো আসে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রাচুর্যের মাধ্যমে, আবার কখনো আসে দুঃখ, কষ্ট, অসুস্থতা কিংবা প্রিয়জন হারানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির আকারে। এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যাতে বান্দার ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা প্রকাশ পায়।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত-

“তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ্‌ যে ব্যক্তির কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দুঃখকষ্টে পতিত করেন।” (সহিহ বুখারি: ৫৬৪৫)

পরীক্ষা কখনোই আল্লাহর অসন্তুষ্টির চিহ্ন নয়; বরং এটি তাঁর ভালোবাসা ও বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন। আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের ঈমানকে শুদ্ধ ও দৃঢ় করার জন্যই তিনি পরীক্ষায় ফেলেন।

হাদ্দাব ইবনু খালিদ আল আযদী ও শাইবান ইবনু ফাররূখ (রহঃ) ….. সুহায়ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-

“রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর।” (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)

কেন আল্লাহ কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি পরীক্ষা করেন?

সব মানুষের সামর্থ্য, ধৈর্য ও দায়িত্ব একরকম নয়। আল্লাহ তায়ালা যাকে যে পরিমাণ শক্তি ও সহ্যশক্তি দিয়েছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই তিনি পরীক্ষা নির্ধারণ করেন। যাদের মাধ্যমে আল্লাহ সমাজকে শিক্ষা দিতে চান, যাদের জীবনকে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চান, তাদের জীবনেই সাধারণত পরীক্ষার মাত্রা বেশি হয়ে থাকে।

মুস‘আব ইবনু সা’দ (রাহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে হতে বর্ণিত-

“তিনি (সা’দ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মানুষের মাঝে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়? তিনি বললেনঃ নাবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা। মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধার্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবিক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে যমীনে চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহ্‌ই থাকে না।” (জামে’ আত-তিরমিজি: ২৩৯৮)

আল্লাহ যাদের মাধ্যমে সমাজকে পথ দেখাতে চান, যাদের ঈমানকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে চান, তাদের জীবনেই তিনি কঠিন পরীক্ষা দেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই আল্লাহ বান্দাকে পরিশুদ্ধ করেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তাকে এমন অবস্থানে পৌঁছে দেন, যেখানে সে অন্যদের জন্য আলোর পথ হয়ে দাঁড়ায়।

নবীদের জীবন আমাদের জন্য সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত

নবী-রাসূলদের জীবন ছিল ত্যাগ, ধৈর্য ও পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। আল্লাহ যাদের সবচেয়ে প্রিয় করেছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁদের জীবন আমাদের শেখায় পরীক্ষা মানেই পরিত্যাগ নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ।

১. হযরত নূহ (আ.): দীর্ঘ ধৈর্য ও অবিচলতার শিক্ষা

হযরত নূহ (আ.) প্রায় ৯৫০ বছর আল্লাহর দাওয়াত প্রচার করেছিলেন। এত দীর্ঘ সময় মানুষের কাছে সত্যের আহ্বান জানিয়েও তিনি অল্প কিছু অনুসারী পেয়েছিলেন। উপহাস, অবজ্ঞা ও প্রত্যাখ্যানের মাঝেও তিনি ধৈর্য হারাননি এবং আল্লাহর আদেশ থেকে এক চুলও সরে যাননি।

২. হযরত ইবরাহিম (আ.): ঈমানের দৃঢ়তা ও তাওয়াক্কুলের শিক্ষা

হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর একত্বের দাওয়াত দেওয়ার কারণে নিজ জাতির বিরোধিতা, এমনকি আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো ভয়াবহ পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তবুও তাঁর ঈমান এক মুহূর্তের জন্যও টলেনি। আল্লাহ তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিদান হিসেবে আগুনকেও তাঁর জন্য শান্তিময় করে দেন।।

৩. হযরত আইয়ুব (আ.): চরম কষ্টে ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত

হযরত আইয়ুব (আ.) বছরের পর বছর কঠিন রোগ, সম্পদহানি ও নিঃসঙ্গতার পরীক্ষায় পতিত হয়েছিলেন। তবুও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি, বরং ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ শেষ পর্যন্ত তাঁর কষ্ট দূর করে তাঁকে আগের চেয়েও উত্তম প্রতিদান দেন।

৪. রাসূলুল্লাহ ﷺ: সব পরীক্ষার মাঝেও অটল বিশ্বাসের আদর্শ

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ জীবনে অপমান, নির্যাতন, সামাজিক বয়কট ও শারীরিক কষ্ট সহ্য করেছেন। তবুও তিনি কখনো আল্লাহর ওপর বিশ্বাস হারাননি, বরং প্রতিটি পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের কী শেখাতে চান?

মানুষের জীবনে আসা প্রতিটি পরীক্ষা নিছক কষ্ট নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে গভীর শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ। আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণ অর্জনের পথ দেখান, যা একজন মুমিনের চরিত্র গঠনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

১. ধৈর্য: ধৈর্য এমন এক মহৎ গুণ, যার প্রতিদান আল্লাহ সীমাহীনভাবে দিয়ে থাকেন। পরীক্ষা ও কষ্টের সময় মানুষ যখন অভিযোগ না করে ধৈর্য ধারণ করে, তখন সে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ করে। ধৈর্য শুধু অপেক্ষা নয়; বরং আল্লাহর ফয়সালার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার নামই ধৈর্য।

 কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“বল, হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। এ দুনিয়ায় যারা ভাল কাজ করবে, তাদের জন্য আছে কল্যাণ। আল্লাহর যমীন প্রশস্ত (এক এলাকায় ‘ইবাদাত-বন্দেগী করা কঠিন হলে অন্যত্র চলে যাও)। আমি ধৈর্যশীলদেরকে তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।” (সূরা যুমার: ১০)

২. তাওয়াক্কুল: মানুষ যখন নিজের সব চেষ্টা শেষ করে অসহায় হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই প্রকৃত তাওয়াক্কুলের জন্ম হয়। বিপদ ও অনিশ্চয়তার মুহূর্তে মানুষ বুঝতে শেখে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতেই। পরীক্ষা আমাদের শেখায়, দুনিয়ার কোনো শক্তিই চূড়ান্ত নয়; প্রকৃত ভরসার জায়গা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“আর তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য করেছেন একটা সুনির্দিষ্ট মাত্রা।” (সূরা আত-তালাক: ৩)

৩. আত্মশুদ্ধি: মানুষ যখন সুখে থাকে, তখন অনেক সময় নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু কষ্ট, বিপদ ও ব্যর্থতা মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। এই সময়েই মানুষ নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ পায় এবং আল্লাহর দিকে আরও ফিরে আসে। পরীক্ষা মানুষের অহংকার ভেঙে দেয়, হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে। এভাবেই বিপদ একজন মুমিনের আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে।

৪. বিনয় ও আত্মসমালোচনা শেখানো: কঠিন সময় মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং নিজের দুর্বলতা চিনতে সাহায্য করে।এই বিনয়ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।

৫. দুনিয়ার বাস্তবতা বোঝানো: আল্লাহ তাআলা পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই দুনিয়া চিরস্থায়ী আবাস নয়; বরং এটি একটি সাময়িক পরীক্ষাকেন্দ্র। এখানে সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, স্বস্তি-কষ্ট সবই ক্ষণস্থায়ী। মানুষ যেন দুনিয়ার চাকচিক্যে ডুবে গিয়ে আখিরাতকে ভুলে না যায়, সে জন্যই আল্লাহ বিভিন্ন সময় পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে বাস্তবতা উপলব্ধি করান।

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“প্রতিটি জীবন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণমাত্রায় বিনিময় দেয়া হবে। যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল, কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)

কষ্টের সময় ঈমান কীভাবে অটুট রাখা যায়?

মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন দুঃখ, সংকট ও পরীক্ষার ভার দীর্ঘ হয়ে ওঠে। তখন হৃদয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মন দুর্বল হয়ে যায়, আর ঈমান নড়বড়ে হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু প্রকৃত মুমিনের জন্য এসব মুহূর্তই হলো আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার শ্রেষ্ঠ সুযোগ। কারণ আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে কষ্ট দিয়ে ধ্বংস করেন না; বরং তাকে শক্ত ও পরিশুদ্ধ করেন।

  1. দোয়া ও ইস্তিগফারকে জীবনের অংশ বানানো
  2. আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা
  3. নামাজ ও কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা
  4. ধৈর্য ধারণ ও হতাশা থেকে দূরে থাকা
  5. নেককার মানুষের সান্নিধ্যে থাকা

পরীক্ষার শেষে একজন মুমিনের জন্য কী অপেক্ষা করে?

আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে পরীক্ষার ভেতর দিয়ে নিয়ে যান, তখন সেই পরীক্ষা কখনো বৃথা যায় না। ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও বিশ্বাসের সঙ্গে যে ব্যক্তি সেই সময় অতিক্রম করে, তার জন্য আল্লাহ এমন সব নিয়ামত জমা করে রাখেন, যা সে নিজেও কল্পনা করতে পারে না।

পরীক্ষা আল্লাহর ভালোবাসারই এক বিশেষ প্রকাশ

মানুষের জীবনে আসা প্রতিটি পরীক্ষা কখনোই অর্থহীন নয়। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকেই তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করেন এবং আত্মিকভাবে উন্নত করেন। এই পরীক্ষাগুলো শাস্তি নয়; বরং বান্দাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

কঠিন সময়ে যখন একজন মুমিন ধৈর্য ধারণ করে, তখন আল্লাহ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও পরিত্যাগ করেন না। বরং সেই কষ্টের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে রহমত, হিকমত ও ভবিষ্যতের কল্যাণ। অনেক সময় দোয়া কবুল হতে দেরি হওয়াও আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনার অংশ, কারণ তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন, কখন এবং কীভাবে বান্দার জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

অতএব, জীবনের প্রতিটি পরীক্ষাকে ভয়ের নয়, বরং আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে- আল্লাহ আমাদের ভেঙে দেওয়ার জন্য নয়, বরং আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তোলার জন্যই পরীক্ষা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *