যিলহজ মাসের ইবাদত ও আমল: কুরআন ও হাদিসের আলোকে সেরা ১০টি করণীয়

যিলহজ মাসের ইবাদত ও আমল কুরআন ও হাদিসের আলোকে সেরা ১০টি করণীয় কাবা শরিফ ছবি

বিষয়বস্তু তালিকা

বছরের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিনগুলো কোনটি? জানেন কি? রমজানের শেষ দশ রাত নয়, বরং যিলহজের প্রথম দশ দিন! এই দিনগুলোতে যেকোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। প্রশ্ন হলো – এই মহামূল্যবান সময়ে আমরা ঠিক কী করব? আজকের এই বিস্তারিত লেখায় কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে যিলহজ মাসের সেরা আমলগুলো জেনে নেব।

যিলহজ মাস কেন এত বিশেষ?

আল্লাহ তা’আলা কোনো কিছুর কসম খান না – যদি না সেটি বিশেষ মর্যাদার হয়। পবিত্র কুরআনে সূরা ফজরে আল্লাহ “দশ রাতের” কসম খেয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসির, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এই দশ রাত হলো যিলহজের প্রথম দশ দিন।

“শপথ ফজরের। এবং (জিলহাজ্জ মাসের প্রথম) দশ রাতের শপথ।” (সূরা আল-ফজর: ১-২)

এই দিনগুলোতে একত্রিত হয় ইসলামের সেরা চারটি ইবাদত – সালাত, সিয়াম, সদকা এবং হজ। পৃথিবীর আর কোনো দিনে এই চারটি মহান ইবাদত একসাথে পালন করার সুযোগ আসে না। তাই এই দিনগুলোকে ইবাদতের মৌসুম বা আমলের শস্যকাল বলা হয়। ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ‘আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমলই উত্তম নয়।তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়?” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।” (সহীহ বুখারী : ৯৬৯)

যিলহজ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ – বিস্তারিত আলোচনা

১. খাঁটি তাওবা ও ইস্তিগফার

যিলহজের ফজিলতপূর্ণ দিনগুলোতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত – (তাওবা করে)হৃদয় থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। তাওবা অর্থ হলো ‘প্রত্যাবর্তন করা’। অর্থাৎ, যে পথ ছেড়ে আসা হয়েছিল, সেই সঠিক পথে আবার ফিরে যাওয়া।

তাওবার তিনটি শর্ত রয়েছে –

  • অতীতের পাপের জন্য অন্তর থেকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া
  • সঙ্গে সঙ্গে সেই পাপ ছেড়ে দেওয়া
  • ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।

যদি পাপটি কোনো মানুষের হক নষ্ট করে থাকে, তাহলে চতুর্থ শর্ত হলো – সেই হক আদায় করা বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

“ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ কর- আন্তরিক তাওবাহ। সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলোকে তোমাদের থেকে মুছে দিবেন, আর তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণাধারা। সে দিন আল্লাহ নবীকে আর তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে লজ্জিত করবেন না। (সেদিনের ভয়াবহ অন্ধকার থেকে মু’মিনদের রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে) তাদের নূর দৌড়াতে থাকবে তাদের সামনে আর তাদের ডান পাশে। তারা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের নূরকে আমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দাও আর আমাদেরকে ক্ষমা কর; তুমি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা তাহরীম: ৮)

যিলহজ মাস আমাদের সামনে এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসে বছরের ফজিলতপূর্ণ দিনগুলোতে পাপমুক্ত হওয়ার। আল্লাহ তা’আলা বান্দার তাওবার অপেক্ষায় থাকেন। বান্দা তাঁর দিকে হেঁটে আসলে, তিনি বান্দার দিকে দৌড়ে আসেন। এটাই তাঁর রহমতের অসীমতা। তাওবা সংক্রান্ত অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা পড়তে ক্লিক করুন।

২. ফরয ও নফল সালাত যত্নসহকারে আদায় করা

সালাত হলো ঈমানের স্তম্ভ এবং বান্দার সাথে আল্লাহর সবচেয়ে সরাসরি সংযোগের মাধ্যম। যিলহজের এই বিশেষ দিনগুলোতে সালাতের প্রতি অতিরিক্ত যত্নবান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধু ফরয নামাজ নয়, বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ, নফল, তাহাজ্জুদ এবং চাশতের নামাজও (সূর্যোদয়ের পর থেকে যোহরের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি নফল ইবাদত) নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করুন।

বিশেষভাবে সেজদায় বেশি সময় কাটানো এবং দীর্ঘ দুআ করা এই মাসের বিশেষ আমল। কারণ সেজদা হলো বান্দার সর্বোচ্চ নম্রতার প্রকাশ এবং আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মুহূর্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“সিজদার অবস্থায়ই বান্দা তার রবের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব, তোমরা (সিজদায়) অধিক পরিমাণ দু’আ পড়বে।” (সহীহ মুসলিম : ৪৮২)

নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন।

৩. যিলহজের প্রথম নয় দিন সিয়াম পালন

যিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের আমল ছিল। দশম তারিখ ঈদের দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ। তাই নয় দিন রোজা রাখা সুন্নত।

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ মাসের নয় তারিখ পর্যন্ত, আশুরার দিন, প্রত্যেক মাসে তিনদিন, মাসের প্রথম সোমবার ও বৃহস্পতিবার সওম রাখতেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৭)

রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিনও সিয়াম পালন করে, আল্লাহ্ তার মুখমণ্ডল কে দোযখের আগুন হতে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেন।” (সহীহ বুখারী : ২৮৪০)

বিশেষ পরামর্শ: যদি পুরো নয় দিন রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত ৯ তারিখ আরাফার দিন একটি রোজা রাখুন — যার ফজিলত অসাধারণ।

৪. আরাফার দিন (৯ই যিলহজ) রোজা রাখা

যিলহজের ৯ তারিখকে বলা হয় ‘ইয়াওমু আরাফা’ বা আরাফার দিন। যা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত দিন। এই দিনটি হজ পালনের মূল স্তম্ভ; এদিন হাজিগণ মক্কার অদূরে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। দিনটি হাজীদের জন্য হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। কিন্তু যারা হজে যাননি, তাদের জন্যও এই দিনটি ইবাদতের দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

”আরাফাহ দিবসের তুলনায় এমন কোন দিন নেই- যেদিন আল্লাহ তা’আলা সর্বাধিক সংখ্যক লোককে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন। আল্লাহ তা’আলা নিকটবতী হন, অতঃপর বান্দাদের সম্পর্কে মালায়িকার সামনে গৌরব প্রকাশ করেন এবং বলেনঃ তারা কী উদ্দেশে সমবেত হয়েছে (বা তারা কী চায়)?” (সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“আর আরাফাহ দিবসের সওম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে।” (সহীহ মুসলিম: ১১৬২) সংক্ষেপিত।

এই একটি রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ! এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে? তাই কোনো অবস্থাতেই এই দিনের রোজা মিস করা উচিত নয়।

বিশেষ পরামর্শ: হজ পালনকারীরা আরাফার দিন রোজা রাখবেন না। কারণ সেদিন তাদের শারীরিক শক্তি দরকার হয় ইবাদতের জন্য। এই নির্দেশনা শুধু হজে না যাওয়া মুসলিমদের জন্য।

৫. তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ – আল্লাহর যিকির

এই দশ দিনে আল্লাহর যিকিরের এক বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) – এই যিকিরগুলো বাড়িতে, বাজারে, রাস্তায়, সর্বত্র উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা সুন্নত। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

“আল্লাহ তাআলার নিকট যিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের (নেক) আমল অপেক্ষা অধিক প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। অতএব, তোমরা এই দিনগুলোতে তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি পাঠ করো।” (মুসনাদে আহমাদ : ৫৪৪৬)

যিকির কেবল মুখের কথা নয়, এটি অন্তরের প্রশান্তি, আত্মার খোরাক এবং আল্লাহর সাথে বান্দার জীবন্ত সম্পর্কের প্রমাণ। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

“তারাই ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই দিলের সত্যিকারের প্রশান্তি লাভ করা যায়।” (সূরা আর-রাদ: ২৮)

যিকিরের ফজিলত ও উপকারিতা অসংখ্য। সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত নিচে তুলে ধরা হলো:

  • অন্তরের প্রশান্তি
  • গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি
  • মিজানের পাল্লা ভারী হয়
  • জান্নাতের গাছ রোপণ
  • শয়তান থেকে সুরক্ষা
  • আল্লাহর স্মরণে স্মরণীয় হওয়া

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যে লোক প্রতিদিন একশ’বার সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহ বলবে তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হলেও।”(সহীহ বুখারী : ৬৪০৫)

তাই এই যিলহজের মহামূল্যবান দিনগুলোতে সুযোগ পেলেই হাঁটতে হাঁটতে, কাজের ফাঁকে, অপেক্ষায় বসে মুখকে আল্লাহর যিকিরে সজীব রাখুন। এটিই সবচেয়ে সহজ অথচ সবচেয়ে ফলপ্রসূ আমল।

দোয়া কবুলের আমল সম্পর্কে আরও পড়ুন। এবং ইখলাসের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে জানুন।

৬. হজ ও ওমরা আদায় করা

হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি এবং এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ৯ই জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনই হজের মূল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুষ্ঠিত হয়। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের জীবনে একবার হজ পালন করা ফরয। কুরআনে আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন, ”তাতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে (যেমন) মাক্বামে ইবরাহীম(ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গা)। যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে নিরাপদ হবে। আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হাজ্জ করা লোকেদের উপর আবশ্যক যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে এবং যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন।” ((সুরা আলে ইমরান : ৯৭)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হাজ্জ হতে ফিরে আসবে যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল।” (সহীহ বুখারী : ১৫২১)

“এক ‘উমরাহ’র পর আর এক ‘উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা। আর জান্নাতই হলো হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান।” (সহীহ বুখারী: ১৭৭৩)

যাদের হজে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, তাদের নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ তা’আলা ঘরে বসেও এই দিনগুলোতে হাজীদের সমতুল্য সওয়াব পাওয়ার সুযোগ রেখেছেন, শুধু সঠিক আমলের মাধ্যমে।

এইরকম কয়েকটি আমল তুলে ধরা হলো-

  • ”যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামাআতে আদায় করে, তারপর সূর্য উঠা পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহ তা’আলার যিকর করে, তারপর দুই রাকাআত নামায আদায় করে- তার জন্য একটি হাজ্জ ও একটি উমরার সাওয়াব রয়েছে।” (জামে তিরমিজি : ৫৮৬)
  • ”যে ব্যক্তি উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে ফরয নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে যায়, সে ইহরামধারী হাজ্জীর অনুরূপ ছওয়াব প্রাপ্ত হবে। অপর পক্ষে যে ব্যক্তি কেবলমাত্র চাশতের নামায আদায়ের জন্য মসজিদে যায় সে উমরাহকারীর ন্যায় ছওয়াব প্রাপ্ত হবে। যে ব্যক্তি এক ওয়াক্ত নামায আদায়ের পর হতে পরের ওয়াক্ত নামায আদায় করাকালীন সময়ের মধ্যে কোনরূপ বেহুদা কাজ ও কথাবার্তায় লিপ্ত না হয়, তার আমলনামা সপ্তাকাশে লিপিবদ্ধ হবে, অর্থাৎ সে উচ্চমর্যাদার অধিকারী হবে।” (সুনান আবু দাউদ : ৫৫৮)

৭. কুরআন তিলাওয়াত ও বেশি বেশি দুরূদ পাঠ

জিলহজ্জের এই বরকতময় দিনগুলোতে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। কুরআনের প্রতিটি অক্ষর তিলাওয়াতের জন্য বহু নেকি পাওয়া যায়। হাদিসে উল্লেখ আছে, কুরআনের একটি হরফ পড়লেও একাধিক সওয়াব লেখা হয়, যা একজন মুমিনের জন্য বিশাল অর্জন। রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ”যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে তার নেকী হবে। আর নেকী হয় দশ গুণ হিসাবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম মিলে একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, এবং মীম আরেকটি হরফ।” (সুনানে তিরমিজি : ২৯১০)

তাই এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিত তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, যাতে সহজেই বেশি নেকি অর্জন করা যায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব হয়।

কুরআনে আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন,

“যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, নামায প্রতিষ্ঠা করে আর আল্লাহ তাদেরকে যে রিযক দিয়েছেন তাথেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন এক ব্যবসায়ের আশা করে যাতে কক্ষনো লোকসান হবে না।” (সূরা ফাতির : ২৯)

পাশাপাশি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর বেশি বেশি দুরূদ পাঠ করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দুরূদ পড়ে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাযিল করেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০৮)

কুরআনের আলোয় আদর্শ জীবন গড়ার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পড়ুন।

৮. কুরবানি করা – ইব্রাহিমি সুন্নতের অনুসরণ

কুরবানী শুধু পশু জবাই করার নাম নয়। এর ভেতরে রয়েছে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ত্যাগের শিক্ষা। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস (তাঁর পুত্র ইসমাইল) ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন, আর সেই চেতনার অনুসরণই হলো কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য। তাই কুরবানী আমাদের শেখায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ইচ্ছা ও প্রিয় জিনিসকে ত্যাগ করার মানসিকতা গড়ে তোলা। কুরআনে বর্ণিত রয়েছে-

“বল, আমার নামায, আমার যাবতীয় ‘ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ (সব কিছুই) বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)।” (সূরা আল-আনআম : ১৬২)

“আল্লাহর কাছে ওগুলোর না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, কাজেই সৎকর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।” (সূরা হজ : ৩৭)

কুরবানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গোশত সঠিকভাবে বণ্টন করা এবং গরিব-অসহায় মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া। সুন্নাহ অনুযায়ী কুরবানীর গোশত থেকে নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেওয়া এবং দরিদ্রদের মাঝে দান করা উত্তম। এতে সমাজে সহমর্মিতা বাড়ে এবং সবাই কুরবানীর আনন্দে অংশ নিতে পারে।

৯. সদকা ও দান-খয়রাত করা

এই বরকতময় দিনগুলোতে সদকা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। সদকা সম্পদ কমায় না, বরং তা বরকত বৃদ্ধি করে, বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ব্যয় করে, তাদের (দানের) তুলনা সেই বীজের মত, যাত্থেকে সাতটি শীষ জন্মিল, প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন, বর্ধিত হারে দিয়ে থাকেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, জ্ঞানময়।” (সূরা বাকারাহ: ২৬১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।” (সহীহ বুখারী: ১৪৪২)। তাই এই সময়টিতে বেশি বেশি সদকা করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং নিজের সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করা উচিত।

ছোট দানের গুরুত্ব ও ইসলামিক জীবন ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ুন। এবং ইসলামে যাকাত ও সাদাকার মূলনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

১০. পরিবারকে সাথে নিয়ে আমল করা ও মুহাসাবা

যিলহজের ফজিলত শুধু ব্যক্তিগত আমলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবারকে এই ইবাদতে সম্পৃক্ত করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব। সন্তানদের তাকবীর শেখানো, পরিবারকে নফল রোজায় উৎসাহিত করা এবং একসাথে কুরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ তৈরি করা পরিবারে ঈমানি আবহ গড়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর” (সূরা আত-তাহরীম: ৬)।

পাশাপাশি এই দিনগুলো আত্মসমীক্ষার উত্তম সময়। নিজের আমল পর্যালোচনা করা, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সংশোধনের পরিকল্পনা নেওয়া একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

রমজান পরবর্তী আমল ও ইবাদত : বছরজুড়ে নেকি অর্জনের ৮টি উপায় পড়ুন।

শেষ কথা

যিলহজের এই দিনগুলো খুবই সীমিত। বছরে একবারই আসে, আর আমরা কেউ জানি না পরেরবার এই সুযোগ পাবো কি না। তাই দেরি না করে এই সময়টাকে কাজে লাগানো দরকার। তাওবা করা, নামাজে মন দেওয়া, রোজা রাখা, যিকির করা, কুরআন পড়া, কুরবানি ও সদকা করা – এই আমলগুলো আমাদের জীবনকে বদলাতে পারে। এতে গুনাহ মাফের আশা থাকে, মন শান্ত হয় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক আরও কাছের হয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মূল্যবান সময় ঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দিন। আমাদের তাওবা কবুল করুন, আমলগুলো গ্রহণ করুন এবং আমাদের পরিবারসহ জান্নাতে স্থান দিন। আমিন।

সওয়াবের নিয়তে পোস্টটি শেয়ার করুন

নগদ/বিকাশ পার্সোনাল 01700000000
ব্যাংক AC : 4567890-567890