
বর্তমান সমাজে বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি আত্মসম্মানহীনতা এবং পরিবারের অশান্তির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে আত্মকর্মসংস্থান কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বও।আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
“বলুন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা স্ব স্ব অবস্থানে কাজ করতে থাক, নিশ্চয় আমি আমার কাজ করব।(১) অতঃপর শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে” (সূরা যুমার: ৩৯)
নবী ﷺ ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বনির্ভর ছিলেন এবং সাহাবারা রাঃ তাদের জীবনে কর্মসংস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রমাণ করেছেন। ইসলাম শেখায়, নিজের শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা উত্তম, যা ব্যক্তির মর্যাদা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সমাজে অবদান বৃদ্ধি করে। শিক্ষা, দক্ষতা ও ন্যায্য উপার্জনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব, এবং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করে। ইসলামে আত্মকর্মসংস্থান কোনো আধুনিক ধারণা নয়; বরং এটি নবী ﷺ–এর সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ।
ইসলামে আত্মকর্মসংস্থানের গুরুত্ব
ইসলাম মানব জীবনের প্রতিটি দিককে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে দেখেছে। তার মধ্যে আত্মকর্মসংস্থান বা নিজের শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, কর্মহীন থাকা কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি আত্মসম্মান ও নৈতিকতার উপরও প্রভাব ফেলে।
মিকদাম ইবনে মাদীকারিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত-
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষের স্বোপার্জিত আয়-রোজগারের চেয়ে উত্তম আয়-রোজগার আর কিছুই নাই। কোন ব্যক্তি তার নিজের জন্য, তার পরিবারের জন্য, তার সন্তানের জন্য এবং তার কর্মচারীর জন্য যা ব্যয় করে তা দান-খয়রাত হিসাবে গণ্য হয়”
(সুনান ইবনে মাজাহ: ২১৩৮)
জীবিকা অর্জন করা শুধু অর্থোপার্জনের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম। নবী ﷺ-এর জীবনেও এটি পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। তিনি ﷺ ব্যবসা-বাণিজ্যে সক্রিয় ছিলেন এবং নিজস্ব পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। এছাড়াও সাহাবায়ে কেরাম রাঃ তাদের জীবনধারায় আত্মকর্মসংস্থানের উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
ইসলাম আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে ব্যক্তি এবং সমাজকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে উপকৃত করে:
১. আত্মনির্ভরতা: নিজের পরিশ্রমে জীবিকা অর্জন করলে কাউর উপর নির্ভরশীল হতে হয় না।
২. আত্মসম্মান: কর্মসংস্থান ব্যক্তির মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩. নৈতিক দিক: পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন ন্যায় এবং ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী জীবিকা অর্জনের শিক্ষা দেয়।
৪. সামাজিক অবদান: একজন স্বনির্ভর ব্যক্তি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মিকদাম (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত-
“তিনি বলেন, নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।” (সহিহ বুখারী : ২০৭২)
ইসলামে আত্মকর্মসংস্থান কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি নৈতিকতা, মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম। বেকারত্ব দূর করার জন্য শিক্ষা, দক্ষতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ।
বেকারত্ব: সমস্যা ও সামাজিক প্রভাব
ইসলামে কর্মের মূল্য অপরিসীম। জীবিকা অর্জন কেবল অর্থোপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি আল্লাহর ইবাদতের অংশ, আত্মসম্মান রক্ষার মাধ্যম এবং সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথ। বেকারত্ব, অর্থাৎ কর্মহীন থাকা, কেবল ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ। বেকারত্ব কেবল অর্থের অভাব নয়, এটি আত্মসম্মান, ধর্ম, নৈতিকতা এবং সমাজের স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে। ইসলামের নির্দেশনা হলো শিক্ষা, দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা, যাতে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখে এবং সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
বেকারত্ব থেকে যে নৈতিক ও সামাজিক প্রভাবগুলো দেখা দেয়, তা হলো:
১. আত্মসম্মান ও মর্যাদা হ্রাস: আল্লাহর পথে পরিশ্রম না করে জীবনধারণ করলে মানুষ নিজের মর্যাদা হারাতে পারে।
২. পরিবারে অশান্তি: জীবিকার অভাবে পরিবারের সুষমতা ও শান্তি বিঘ্নিত হয়।
৩. সামাজিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি: বেকার ব্যক্তি প্রায়শই অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা ইসলামের স্বনির্ভরতার নীতি লঙ্ঘন করে।
৪. অনৈতিক পথে প্রলোভন: পরিশ্রমে ব্যর্থ হলে মানুষ কখনও কখনও অবৈধ বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে পারে।
৫. মানসিক চাপ ও হতাশা: কর্মহীনতার কারণে হতাশা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়, যা হৃদয়কে দুর্বল করে।
৬. ধর্মীয় ক্ষতি: আল্লাহর পথে পরিশ্রম না করা, নিজের দায়িত্ব অবহেলা করা, এবং অভাবের কারণে ইবাদতে ব্যর্থ হওয়া ধর্মীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে জীবিকা অর্জনকে শুধুমাত্র অর্থোপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়নি। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, পরিশ্রম, সততা এবং ন্যায়ের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা ধর্মের অংশ এবং মানুষের নৈতিক ও সামাজিক উন্নতির মাধ্যম, যা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর-পথে-আহ্বান ও দ্বীনের সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরে।
নবী ﷺ-এর জীবনও এই নীতি প্রতিফলিত করে। তিনি ﷺ ব্যবসা-বাণিজ্যে সক্রিয় ছিলেন এবং নিজস্ব শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। এছাড়া সাহাবারা রাঃ-রাও তাদের জীবনে পরিশ্রম ও ব্যবসাকে ধর্মানুগ জীবিকার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
কুরআনে জীবিকা অর্জনের শিক্ষার মূল দিকগুলো:
১. পরিশ্রম ও উদ্যোগ: জীবিকা অর্জনের জন্য আল্লাহর পথে পরিশ্রম করা আবশ্যক।
২. ন্যায় ও সততা: উপার্জন অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত ও ইসলামের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
৩. আত্মনির্ভরতা: পরিশ্রমের মাধ্যমে অন্যের উপর নির্ভরশীল হওয়া এড়ানো।
৪. আল্লাহর সন্তুষ্টি: ন্যায্য উপার্জন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম।
নবী ﷺ-এর স্বনির্ভরতা
নবী করিম ﷺ-এর জীবন আমাদের জন্য স্বনির্ভরতা ও পরিশ্রমের সর্বোত্তম উদাহরণ। ইসলামে শুধু দীনীয় শিক্ষা নয়, দৈনন্দিন জীবনের জন্যও নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে নবী ﷺ নিজের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে নৈতিক ও সামাজিক আদর্শ স্থাপন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ও স্বনির্ভর ছিলেন। তাঁর পিতামাতা মারা যাওয়ার পর, তিনি নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন। বিশেষ করে, হজরত খাদিজা রাঃ এর সাথে ব্যবসায় অংশগ্রহণ তাঁর স্বনির্ভরতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। নবী ﷺ সর্বদা সততা, পরিশ্রম এবং ন্যায়ের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন।
১. খাদিজা রাঃ-এর সাথে ব্যবসা: নবী ﷺ পরিণত বয়সে হজরত খাদিজা রাঃ এর ব্যবসায়িক কাজে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি পণ্য পরিবহন, লেনদেন এবং ব্যবসায়িক চুক্তি নিজে দেখাশোনা করতেন। এই ব্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি সততা ও ন্যায়ের উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন।
২. হস্তশিল্প ও কাজের মাধ্যমে জীবিকা: নবী ﷺ গৃহস্থ জীবনের সময় মরুতে যাত্রা ও ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে জীবন চালাতেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি কখনো অন্যের উপর নির্ভরশীল হননি।
৩. সাহাবাদের উদাহরণ অনুসরণ: নবী ﷺ-এর প্রেরণায় সাহাবারা রাঃ ব্যবসা, কৃষি, হস্তশিল্প ইত্যাদির মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছিলেন। যেমন হজরত আবু বকর রাঃ এবং হজরত আলী রাঃ নিজের পেশা ও শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন।
নবী ﷺ-এর জীবিকা অর্জনের মূল শিক্ষা হলো:
১. পরিশ্রমের গুরুত্ব: আল্লাহর ইবাদত ও দোয়ার পাশাপাশি নিজের পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ।
২. ন্যায় ও সততা: জীবিকা অর্জন সর্বদা ইসলামের ন্যায়নীতি অনুযায়ী হতে হবে।
৩. আত্মনির্ভরতা: অন্যের উপর নির্ভর না করে নিজের সামর্থ্যে জীবিকা অর্জন।
৪. সামাজিক শিক্ষা: সমাজে স্বনির্ভর ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ সবসময় সম্মান ও প্রভাব তৈরি করে।
সাহাবায়ে কেরামের কর্মসংস্থান
ইসলাম শুধু ইবাদতের ওপর জোর দেয় না, বরং কর্ম, পরিশ্রম এবং জীবিকা অর্জনকেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। নবী ﷺ-এর নির্দেশনা ও সাহাবাদের জীবনই প্রমাণ করে যে, স্বনির্ভরতা ও পরিশ্রম মুসলমানের জন্য নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
সাহাবায়ে কেরাম রাঃ-রা বিভিন্ন পেশা ও শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। তাদের জীবন থেকে আমরা বাস্তব উদাহরণগুলো শিখতে পারি:
১. হজরত আবু বকর রাঃ : হজরত আবু বকর রাঃ ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। নবী ﷺ-এর যুগে তিনি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি নিজস্ব শ্রম ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করতেন, যা পরবর্তীতে ইসলামিক দান ও সাহায্যের কাজে ব্যবহার করতেন।
২. হজরত উসমান রাঃ : হজরত উসমান রাঃ বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি-রফতানিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ইসলামের ন্যায়নীতি অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং তার উপার্জনকে দান ও সমাজকল্যাণে ব্যবহার করতেন।
৩. হজরত আলী রাঃ : হজরত আলী রাঃ ছিলেন কৃষক ও হস্তশিল্পী। তিনি নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে খাদ্য ও জীবিকা অর্জন করতেন। এটি আমাদের শেখায় যে, পরিশ্রম যে কোনো পেশায় হতে পারে, তবে স্বনির্ভরতার মূল লক্ষ্য একই – আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
৪. হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু মসউদ রাঃ : তিনি শিক্ষা ও বই বিক্রি করে জীবিকা অর্জন করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষা ও শ্রম একসাথে ইসলামে উচ্চ মর্যাদা রাখে।
ইসলামে পেশা ও ব্যবসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
ইসলামে জীবিকা অর্জন কেবল অর্থোপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি নৈতিকতা, সততা, স্বনির্ভরতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। নবী ﷺ এবং কুরআন আমাদের জীবিকা ও ব্যবসায় অংশগ্রহণের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।
১. হালাল আয়ের প্রতি গুরুত্ব: ইসলামে পেশা ও ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো হালাল উপার্জন। যে পেশা বা ব্যবসার মাধ্যমে আয় করা হয়, তা অবশ্যই হারাম উপাদান যেমন সুদ, জুয়া, মদ, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে মুক্ত হতে হবে। হালাল আয় মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্য কল্যাণকর
২. সততা ও ন্যায়পরায়ণতা: ব্যবসা ও পেশাগত জীবনে সততা ইসলামের অন্যতম প্রধান নির্দেশনা। পণ্যের দোষ গোপন করা, মিথ্যা কথা বলা বা মানুষকে ধোঁকা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একজন মুসলিম ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী ব্যক্তি তার কথা ও কাজে বিশ্বস্ত হবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা।
৩. সুদ (রিবা) থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা: ইসলামে সুদকে কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে। তাই যেকোনো পেশা বা ব্যবসায় সুদি লেনদেন, সুদি ঋণ বা সুদের সাথে জড়িত কর্মকাণ্ড পরিহার করা আবশ্যক। সুদমুক্ত ও ন্যায্য লেনদেন ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি।
৪. মানুষের ক্ষতি হয় এমন পেশা বর্জন: যেসব পেশা বা ব্যবসার মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ বা নৈতিকতার ক্ষতি হয় সেগুলো ইসলামে নিষিদ্ধ। যেমন: মাদক ব্যবসা, অশ্লীলতা ছড়ানো, ভেজাল উৎপাদন, বা মানুষের অধিকার নষ্ট করে এমন কাজ। ইসলাম মানুষের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
৫. ন্যায্য মূল্য ও পরিমাপে পূর্ণতা: ব্যবসার ক্ষেত্রে সঠিক ওজন ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ। কম ওজন দেওয়া বা অযথা অতিরিক্ত দাম নেওয়া গুনাহের কাজ। ন্যায়ভিত্তিক লেনদেন ব্যবসায় বরকত বৃদ্ধি করে।
৬. চুক্তি ও লেনদেনে স্বচ্ছতা: দেনা-পাওনা বা অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসায় স্পষ্ট চুক্তি করা ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। লিখিত চুক্তি ভুল বোঝাবুঝি ও বিবাদ থেকে রক্ষা করে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখে।
৭. দায়িত্ব ও আমানত রক্ষা: চাকরি হোক বা ব্যবসা নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা একজন মুসলিমের কর্তব্য। অফিসের সময় নষ্ট করা, কাজে অবহেলা করা বা আমানতের খেয়ানত করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
৮. শ্রমের মর্যাদা ও পরিশ্রম: নিজের শ্রমের মাধ্যমে উপার্জনকে ইসলাম সম্মান দিয়েছে। পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভরশীল পেশা বরকতময়। অলসতা ও অন্যায় উপায়ে আয় করার প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।
স্বনির্ভরতা ও সমাজে অবদান
ইসলামে স্বনির্ভরতা কেবল ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার মাধ্যম নয়; এটি সমাজের কল্যাণ ও নৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নবী ﷺ এবং সাহাবাদের জীবন দেখায় যে, একজন মুসলমানের পরিশ্রম ও জীবিকা অর্জন শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য উদাহরণ ও অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
নবী ﷺ-এর উদাহরণ
নবী ﷺ ব্যবসায় ও শ্রমের মাধ্যমে নিজের জীবিকা অর্জন করতেন। তিনি কখনো অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতেন না, এবং সর্বদা সততা ও ন্যায়ের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। তাঁর এই জীবনধারা মুসলমানদের শেখায় যে, স্বনির্ভর হওয়া ইসলামী নৈতিকতার একটি অংশ।
সাহাবাদের উদাহরণ
১. হজরত আবু বকর রাঃ: হজরত আবু বকর রাঃ ছিলেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী এবং প্রথম খলিফা। তিনি ব্যবসায় খুবই দক্ষ ছিলেন। ব্যবসায়িক জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে তিনি নিজের ও পরিবারকে স্বাবলম্বী রাখার পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র ও অসহায়দের সাহায্য করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে, হজরত আবু বকর রাঃ প্রায়ই দান ও জাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করার কাজ করতেন। তার জীবনের এই দৃষ্টান্ত আমাদের শেখায়, নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনধারণ করা কেবল আত্মনির্ভরতা নয়, বরং সমাজসেবা ও দানের মাধ্যমে মানবিক দায়িত্ব পালন করার পথও খুলে দেয়।
২. হজরত আলী রাঃ: হজরত আলী রাঃ নবীর চাচাত ভাই ও জামাতা ছিলেন। তিনি কৃষি ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। কেবল অর্থ উপার্জন করাই নয়, তিনি তা ন্যায় ও সততার সাথে পরিচালনা করতেন। পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি, তিনি সমাজের অন্যান্য মানুষের জন্যও উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। হস্তশিল্পে দক্ষতার কারণে তার কাজের মান খুবই স্বীকৃত ছিল। তার জীবন আমাদের শেখায়, যে কোনো পেশা বা শিল্পকে সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিচালনা করলে তা কেবল নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও উপকারী হয়।
৩. হজরত উসমান রাঃ: হজরত উসমান রাঃ ছিলেন তৃতীয় খলিফা। তিনি ব্যবসায় ন্যায় ও সততার মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতেন। তার ব্যবসায়িক জীবন ছিল উদাহরণস্বরূপ; তিনি কখনো প্রতারণা বা অন্যায় পদ্ধতি ব্যবহার করতেন না। উপার্জিত সম্পদ দিয়ে তিনি দান করতেন, দরিদ্রদের সাহায্য করতেন এবং বিভিন্ন ইসলামি কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতেন। তার জীবন আমাদের শেখায়, আর্থিক সফলতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং সমাজকল্যাণে ব্যবহার করলে তা প্রকৃত অর্থে মূল্যবান হয়।
সমাজে স্বনির্ভরতার গুরুত্ব
স্বনির্ভরতা আমাদের শেখায় যে জীবনকে সফল ও মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য নিজের পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করা উচিত। এটি কেবল অর্থোপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং নৈতিকতা, সততা এবং ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। একজন স্বনির্ভর ব্যক্তি সমাজে নির্ভরশীলতার চাপ কমায়, নিজের ও পরিবারের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং অর্জিত সম্পদকে দান ও সমাজকল্যাণে ব্যয় করতে পারে। এছাড়া, স্বনির্ভরতা মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ দেয় এবং সমাজে সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। ফলে, এটি শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, পুরো সমাজের উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ব্যয় করে, তাদের (দানের) তুলনা সেই বীজের মত, যাত্থেকে সাতটি শীষ জন্মিল, প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন, বর্ধিত হারে দিয়ে থাকেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, জ্ঞানময়।” (সুরা বাকারা: ২৬১)
ইসলামে বেকারত্ব দূর করার কার্যকর পথ
ইসলাম মানুষের জন্য পরিশ্রম, শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার মাধ্যমে জীবিকা অর্জনকে একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। বেকারত্ব কেবল অর্থের অভাব নয়; এটি আত্মসম্মানহীনতা, নৈতিক ক্ষতি এবং সামাজিক নির্ভরশীলতার কারণ হতে পারে। তাই ইসলামে বেকারত্ব দূর করার জন্য কার্যকর কিছু উপায় নির্দেশিত হয়েছে।
১. শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন: নবী ﷺ ও সাহাবাদের জীবন দেখায় যে, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মানুষ স্বনির্ভর হতে পারে। আল্লাহর পথে শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত দক্ষতা জীবিকা অর্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
২. ন্যায্য ব্যবসা ও পেশায় নিয়োজিত হওয়া: ইসলামে ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি, হস্তশিল্প এবং সেবা ভিত্তিক পেশায় নিয়োজিত হওয়া পূর্ণভাবে বৈধ ও সুসংগত। নবী ﷺ নিজেই ব্যবসায়িক জীবিকা অর্জন করেছিলেন, এবং সাহাবারা তাদের জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক অবদান রেখেছিলেন।
৩. পরিশ্রম ও স্বনির্ভরতা: স্বনির্ভরতা কেবল ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়; এটি নৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি এবং ইসলামে সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করে একজন মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে, সমাজে নির্ভরশীলতার চাপ কমায় এবং উপার্জিত অর্থকে দান ও কল্যাণে ব্যবহার করতে পারে। নবী ﷺ ও সাহাবাদের জীবন দেখায় যে পরিশ্রম ও সততা কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং সমাজের জন্য একটি আদর্শ ও দায়িত্বশীল আচরণের উদাহরণ।
৪. সাহায্য ও দানের মাধ্যমে সহযোগিতা: সাহাবাদের উদাহরণ দেখায়, জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি অর্জিত সম্পদকে দান ও সাহায্যে ব্যবহার করলে সমাজে বেকারত্বের প্রভাব কমানো যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, হকদারদের হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে কত উত্তম উপদেশই না দিচ্ছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।” (সূরা নিসা: 58)
৫. উদ্যোগী হওয়া এবং নতুন সুযোগ তৈরি করা: বেকারত্ব দূর করার জন্য ব্যক্তি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ এবং উদ্ভাবনীভাবে নিজের যোগ্যতা ব্যবহার করতে পারে। নবী ﷺ এবং সাহাবারা নতুন পেশা ও ব্যবসায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছেন।