সদকায়ে জারিয়া: মৃত্যুর পরেও যে আমলের সওয়াব বন্ধ হয় না

সদকায়ে জারিয়া নিয়ে ইসলামিক বাংলা ডিজাইন, যেখানে মসজিদ, গাছের চারা ও দান-সদকার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে মৃত্যুর পরও চলমান সওয়াবের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে

বিষয়বস্তু তালিকা

সদকায়ে জারিয়া (صدقة جارية) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো প্রবহমান বা চলমান দান। এটি এমন একটি বিশেষ ধরনের দান বা সৎকাজ যা মৃত্যুর পরেও থামে না, বরং যতদিন মানুষ সেই দান থেকে উপকৃত হতে থাকে, ততদিন দাতার আমলনামায় সওয়াব যোগ হতে থাকে।

ইসলামের পরিভাষায় এটিকে “চলমান সদকা” ও বলা হয়। এটি শুধু একটি দান নয়, এটি আখিরাতের একটি বিনিয়োগ, যা দুনিয়ায় মানুষের কাজে আসে এবং পরকালে দাতার মিজানে ভারী হয়। আমাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সদকায়ে জারিয়ার প্রভাব হতে পারে চিরস্থায়ী।

সদকায়ে জারিয়ার ফজিলত – হাদিসের আলোকে

ইসলামে এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কারণ, মানুষ দুনিয়া থেকে চলে গেলেও এই আমলের সওয়াব তার আমলনামায় অব্যাহতভাবে যোগ হতে থাকে। তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুসলিমদের এমন কাজ করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন, যা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপকারে আসে। আবূ হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। ১. সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা ২. এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে।” (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)

এই হাদিসটির বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, মৃত্যু মানুষের সব কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়, কিন্তু তিনটি আমল মৃত্যুকেও অতিক্রম করে। এর মধ্যে সদকায়ে জারিয়া সর্বপ্রথম উল্লেখ করা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

“ঈমানদার ব্যাক্তির মৃত্যুর পর তার যেসব কাজ ও তার যেসব পুণ্য তার সাথে যুক্ত হয় তা হলঃ যে জ্ঞান সে অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং তার প্রচার করেছে, তার রেখে যাওয়া সৎকর্মপরায়ণ সন্তান, কুরআন যা সে ওয়ারিসী সূত্রে রেখে গেছে অথবা মাসজিদ যা সে নির্মাণ করিয়েছে অথবা পথিক-মূসা ফিরদের জন্য যে সরাইখানা নির্মাণ করেছে অথবা পানির নহর যা সে খনন করেছে অথবা তার জীবদ্দশায় ও সুস্থাবস্থায় তার মাল থেকে যে দান-খয়রাত করেছে তা তার মৃত্যুর পরও তার সাথে (তার আমলনামায়) যুক্ত হবে।” (ইবনে মাজাহ: ২৪২)

কুরআনে সদকার অসাধারণ প্রতিদান

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা সদকা ও আল্লাহর পথে ব্যয় করার ফজিলত অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। একজন মুমিন যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে, তখন আল্লাহ সেই দানের প্রতিদান বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে দানশীলদের জন্য অফুরন্ত সওয়াব, বরকত এবং আখিরাতের সফলতার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে আল্লাহর পথে ব্যয়ের পুরস্কার সম্পর্কে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বলেছেন,

“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ব্যয় করে, তাদের (দানের) তুলনা সেই বীজের মত, যাত্থেকে সাতটি শীষ জন্মিল, প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা এবং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন, বর্ধিত হারে দিয়ে থাকেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, জ্ঞানময়।” (সূরা বাকারা: ২৬১)

একটি বীজ থেকে ৭ × ১০০ = ৭০০ গুণ ফল পাওয়া যায়। অর্থাৎ আল্লাহর পথে ১ টাকা দান করলে ন্যূনতম ৭০০ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়। আর আল্লাহ চাইলে এর চেয়েও বেশি দিতে পারেন। এটি কেবল দুনিয়ার কোনো বিনিয়োগে সম্ভব নয়।

এছাড়াও আল্লাহ বলেন:

“যারা নিজেদের মাল রাতে ও দিনে, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ব্যয় করে থাকে, তাদের জন্য সেই দানের সওয়াব তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে এবং তাদের কোন ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।” (সূরা বাকারা: ২৭৪)

এই আয়াতটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এখানে প্রকাশ্য ও গোপন উভয় ধরনের দানকেই সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ লোকদেখানো নয়, বরং একনিষ্ঠ নিয়তে করা দানই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।

সদকায়ে জারিয়ার বিভিন্ন রূপ – কীভাবে শুরু করবেন?

সদকায়ে জারিয়া করার সুযোগ আমাদের চারপাশেই আছে। বড় সম্পদ না থাকলেও ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে এই অমূল্য আমল শুরু করা সম্ভব:

১. মসজিদ নির্মাণ বা সহায়তা করা: মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকায়ে জারিয়া। কারণ, মসজিদ হলো ইবাদত, শিক্ষা এবং দ্বীনের প্রচারের কেন্দ্র। একজন মানুষ মসজিদ নির্মাণে অর্থ, শ্রম বা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করলে, সেখানে যতদিন সালাত, কুরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি কার্যক্রম চলতে থাকবে, ততদিন তার আমলনামায় সওয়াব পৌঁছাতে থাকবে। পুরো মসজিদ নির্মাণ করা সম্ভব না হলেও একটি ইট, একটি পাখা, জায়নামাজ, কুরআন শরীফ বা বিদ্যুতের খরচ বহন করাও এই মহান সওয়াবের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।  রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে মাসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্যে জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন।” (সহীহ বুখারী: ৪৫০)

২. কূপ বা পানির ব্যবস্থা করা: পানির কষ্টে থাকা মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সদকায়ে জারিয়া। কোনো এলাকায় কূপ খনন করা, টিউবওয়েল স্থাপন করা, পানির ট্যাংক বা ফিল্টারের ব্যবস্থা করা, কিংবা পথচারীদের জন্য পানির ব্যবস্থা করা দীর্ঘমেয়াদি নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ যতদিন সেই পানি পান করবে এবং উপকৃত হবে, ততদিন দানকারীর আমলনামায় সওয়াব পৌঁছাতে থাকবে। বিশেষ করে যেখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, সেখানে পানির ব্যবস্থা করা মানুষের জীবন রক্ষা ও কষ্ট দূর করার বড় মাধ্যম। তাই ইসলামে এটি অন্যতম উত্তম সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।  হাদিসে বলা হয়েছে,

সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! উম্মু সা’দ মৃত্যুবরণ করেছেন (তার পক্ষ হতে) কোন সাদাকা সর্বোত্তম হবে? তিনি বললেনঃ পানি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি (সা’দ) একটি কূপ খনন করে বললেন, এটা উম্মু সা’দের (কল্যানের) জন্য ওয়াকফ। (আবু দাউদ: ১৬৮১)

৩. ইলম বা জ্ঞান বিতরণ করা: ইসলামে উপকারী ইলম বা জ্ঞান প্রচার করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকায়ে জারিয়া। কারণ, সম্পদ একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু উপকারী জ্ঞান মানুষের মাঝে দীর্ঘদিন জীবিত থাকে। কেউ যদি কুরআন শিক্ষা দেয়, দ্বীনি বই লেখে, ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, অনলাইনে উপকারী ইসলামিক জ্ঞান প্রচার করে বা মানুষকে সঠিক পথের শিক্ষা দেয়, তাহলে সেই জ্ঞান থেকে মানুষ যতদিন উপকৃত হবে, ততদিন তার আমলনামায় সওয়াব পৌঁছাতে থাকবে। বিশেষ করে এমন জ্ঞান, যা মানুষের ঈমান, ইবাদত ও চরিত্র সংশোধনে সাহায্য করে, তা মৃত্যুর পরও অবিরাম নেকির উৎস হয়ে থাকে। 

৪. গাছ লাগানো: গাছ লাগানো ইসলামে একটি স্থায়ী সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হয়। একটি গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, মানুষের জন্য ছায়া ও ফল দেয় এবং বহু প্রাণীর খাদ্যের উৎস হয়। তাই এই কাজ শুধু দুনিয়ার উপকার নয়, আখিরাতের জন্যও সওয়াবের কারণ হয়ে থাকে। কেউ গাছ লাগালে এবং তা থেকে মানুষ বা প্রাণী উপকৃত হলে, তার জন্য সদকার সওয়াব চলতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কোন মুসলিম যদি কোন গাছ লাগায়, আর তা থেকে মানুষ কিংবা চতুষ্পদ জন্তু অথবা পাখী খেয়ে নেয়, তবে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তা তার জন্যে সাদাকা হিসেবে থাকবে।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৫২) 

৫.এতিম ও দরিদ্রদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা: এতিম ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা দেওয়া তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। একজন শিশু যখন শিক্ষা পায়, তখন তার জীবন পরিবর্তন হয়, পরিবার উপকৃত হয় এবং সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই পরিবর্তনের প্রতিটি ভালো ফল শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির জন্য সওয়াবের কারণ হয়। কারণ উপকারী জ্ঞান যতদিন কাজ করে, ততদিন এর প্রতিদান চলতে থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,“আমি ও ইয়াতীমের দেখাশুনাকারী জান্নাতে এভাবে (একত্রে) থাকব। এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলদ্বয় মিলিয়ে ইঙ্গিত করে দেখালেন।“(সহীহ বুখারী: ৬০০৫)

সদকায়ে জারিয়া কীভাবে আমাদের আখিরাতে কাজে আসে?

সদকায়ে জারিয়া এমন একটি আমল, যার প্রভাব মানুষের মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। এটি এমন নেক কাজ, যা সমাজে উপকার রেখে যায় এবং সেই উপকার যতদিন অব্যাহত থাকে, ততদিন এর সওয়াবও দানকারীর আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। ইসলামে এই ধরনের আমলকে আখিরাতের জন্য স্থায়ী সম্পদ হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং মানুষের জীবন, শিক্ষা, ইবাদত ও প্রয়োজন পূরণে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখে।  আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত দাও এবং যে নেক আমল তোমরা নিজদের জন্য আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকট পাবে। তোমরা যা করছ নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরা বাকারা: ১১০)

সদকায়ে জারিয়া মূলত আমাদের জন্য কবরে ও হাশরের ময়দানে আলোর উৎস হয়ে দাঁড়ায়। যখন কারো কাছে নেক আমল কম থাকবে, তখন এই চলমান সদকার সওয়াব তার মিজানকে ভারী করতে পারে।

পাশাপাশি, সদকায়ে জারিয়া সমাজে দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ নিয়ে আসে। একটি মসজিদে লক্ষ মানুষ নামাজ পড়ে, একটি কূপ থেকে হাজার মানুষ পানি পান করে, একটি স্কুল থেকে হাজার শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জন করে। এই প্রতিটি উপকারের সওয়াব দাতার কাছে পৌঁছাতে থাকে।

উপসংহার: আজই শুরু করুন

সদকায়ে জারিয়া কোনো বড় সম্পদের উপর নির্ভর করে না। ছোট একটি দানও যদি দীর্ঘ সময় মানুষের উপকারে আসে, সেটিই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে মূল শিক্ষা হলো সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া এবং সমাজে উপকার রেখে যাওয়া। এই আমল যত ছোটই হোক, যদি তা স্থায়ীভাবে মানুষের কাজে লাগে, তাহলে এর সওয়াব অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,“কাজেই তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্যমত ভয় কর, তোমরা (তাঁর বাণী) শুন, তোমরা (তাঁর) আনুগত্য কর এবং (তাঁর পথে) ব্যয় কর, এটা তোমাদের নিজেদেরই জন্য কল্যাণকর। যারা অন্তরের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা পেল, তারাই সফলকাম।”(সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)

মানুষের জীবন সীমিত, কিন্তু সদকায়ে জারিয়ার ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী। মৃত্যু শেষে যখন অন্যান্য সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই চলমান নেক কাজগুলোই মানুষের জন্য সওয়াবের উৎস হয়ে থাকে। তাই দেরি না করে এখন থেকেই ছোট ছোট কাজ শুরু করা উচিত, যেমন গাছ লাগানো, শিক্ষায় সহযোগিতা করা, পানি সরবরাহে অংশ নেওয়া বা মসজিদ ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে সহায়তা করা

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সদকায়ে জারিয়ার তাওফিক দান করুন এবং এর মাধ্যমে আখিরাতে সফলতা অর্জনের সুযোগ দিন। আমিন।  আরও পড়ুন

সওয়াবের নিয়তে পোস্টটি শেয়ার করুন

নগদ/বিকাশ পার্সোনাল 01700000000
ব্যাংক AC : 4567890-567890