ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীকী চিত্র যেখানে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শারীরিকভাবে অক্ষম ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিভিন্ন অবস্থা প্রদর্শিত হয়েছে

প্রতিবন্ধিতা কোনো রোগ বা অভিশাপ নয়, বরং এটি শারীরিক বা মানসিক অবস্থার একটি ভিন্নতা মাত্র। একজন মানুষ জন্মগতভাবে বা দুর্ঘটনার কারণে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হতে পারেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বোঝা উচিত যে, তারা সমাজের বোঝা নন, বরং আমাদেরই অংশ। তাদের প্রতি করুণা নয়, বরং সম্মান ও সমান সুযোগ প্রদান করা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। যখন আমরা তাদের সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে গুরুত্ব দেব, তখনই একটি আদর্শ সমাজ গঠন সম্ভব হবে। প্রতিটি মানুষেরই মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেই অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের মানবিকতার পরিচয়।

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও মর্যাদা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দয়া বা করুণার পাত্র হিসেবে নয়, বরং পূর্ণ মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক রূপ বা শারীরিক সক্ষমতাকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারণ করেননি, বরং শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হলো অন্তরের পবিত্রতা, ইখলাস ও তাকওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, মানুষের ভেদাভেদ কেবল পরিচয়ের জন্য, সম্মানের ভিত্তি হলো আমল। আল্লাহ বলেন, “হে মানুষ! তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।” (সূরা হুজুরাত: ১৩)

ইসলাম যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও আত্মসম্মানকে কতটা গুরুত্ব দেয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো পবিত্র কুরআনের সূরা আবাসা। এই সূরার অবতরণের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় সাহাবী ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)। তিনি ছিলেন একজন জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী (অন্ধ) ব্যক্তি। একদিন রাসূল (সা.) মক্কার কয়েকজন প্রভাবশালী কুরাইশ নেতাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন এবং তাদের বোঝাতে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে হযরত আবদুল্লাহ (রা.) সেখানে উপস্থিত হন এবং রাসূল (সা.)-এর ব্যস্ততা বুঝতে না পেরে উচ্চস্বরে দ্বীন সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেন।

দৃষ্টিহীন হওয়ার কারণে তিনি বুঝতে পারেননি যে রাসূল (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় আছেন। বারবার প্রশ্ন করায় রাসূল (সা.) কিছুটা বিরক্ত হলেন এবং তাঁর মুখমণ্ডলে সামান্য বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল (যা অন্ধ সাহাবী দেখতে পাননি)। রাসূল (সা.) মনে করেছিলেন, কুরাইশ নেতারা হয়তো ইসলামের প্রতি আগ্রহী হতে পারে, তাই তাদের সময় দেওয়া বেশি জরুরি। কিন্তু মহান আল্লাহ বিষয়টি পছন্দ করেননি। তিনি জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে সূরা আবাসা নাযিল করেন, যেখানে বলা হয়েছে: “তিনি প্রক্ষিপ্ত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ, তার কাছে এক অন্ধ আগমন করল। আপনি কি জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হত, কিংবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে উপদেশ তার উপকারে লাগত।(সূরা আবাসা, আয়াত: ১-৩)। এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে আসতে দেখতেন, তখনই নিজের গায়ের চাদরটি বিছিয়ে দিতেন যাতে তিনি সেখানে বসতে পারেন। তিনি অত্যন্ত সম্মান জানিয়ে বলতেন, “স্বাগতম সেই ব্যক্তিকে, যার কারণে আমার প্রতিপালক আমাকে ভর্ৎসনা বা সংশোধন করেছেন!” তিনি সবসময় তাঁর খোঁজখবর নিতেন এবং তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো, শারীরিক দৃষ্টিশক্তি না থাকা সত্ত্বেও রাসূল (সা.) তাঁর যোগ্যতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। রাসূল (সা.) যখনই মদীনার বাইরে কোনো যুদ্ধে বা সফরে যেতেন, তখন তিনি আবদুল্লাহ (রা.)-কে মদীনার অস্থায়ী আমীর বা গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করে যেতেন। তিনি প্রায় ১৩ বার মদীনার শাসনভার পরিচালনা করেছেন এবং নামাযে ইমামতি করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে শারীরিক অক্ষমতা রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় বড় দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর কর্ম ও বাণীর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চেহারা ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি লক্ষ্য করেন না, বরং তিনি তোমাদের কার্যকলাপ ও অন্তরের দিকে লক্ষ্য রাখেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৪৩)

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য

সামাজিকভাবে আমরা অনেক সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন করি, যা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে, সমাজ একটি দেহের মতো; দেহের এক অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে যেমন পুরো শরীর তা অনুভব করে, তেমনি সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাই-বোনদের কষ্ট অনুভব করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।

১। স্বাভাবিক আচরণ ও একাকীত্ব দূর করা: আমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো তাদের সাথে করুণার ছলে নয়, বরং স্বাভাবিক ও সম্মানজনক আচরণ করা। তাদের একাকীত্ব দূর করতে পাড়া-প্রতিবেশী হিসেবে তাদের খোঁজখবর রাখা এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং এটি ঈমানের দাবি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে,আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন।যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দুর করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। (সহীহ বুখারী: ২৪৪২)

২। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক শক্তি: সমাজ যদি তাদের প্রতি ইতিবাচক ও সহমর্মিতার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, তবে তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের অবজ্ঞা করা বা তুচ্ছ জ্ঞান করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সাবধান করে বলেছেন: হে মু’মিনগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরা যেন অন্য নারীদেরক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারিণীদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অন্যের নিন্দা করো না, একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর (ঈমানের আগে কৃত অপরাধকে যা মনে করিয়ে দেয় সেই) মন্দ নাম কতই না মন্দ! (এ সব হতে) যারা তাওবাহ না করে তারাই যালিম। (সূরা হুজুরাত: ১১)

৩। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও অংশগ্রহণ: স্কুল, কলেজ, মসজিদ বা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। তাদের উৎসাহ প্রদান করলে তারা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পারবে। মনে রাখতে হবে, তাদের সাহায্য করা বা তাদের পথ সহজ করে দেওয়া একটি ‘সদকা’। নবী করীম (সা.) এরশাদ করেছেন, তোমার ভাইয়ের সামনে তোমার মুচকি হাসি সাদ্‌কা স্বরূপ। সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজের নিষেধ করাও সাদ্‌কা, পথ হারানো ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেওয়াও সাদ্‌কা, দৃষ্টিহীনকে পথ দেখানোও সাদ্‌কা, রাস্তা থেকে পাথর, কাটা, হাড্ডি বিদূরিত করাও তোমার জন্য সাদ্‌কা, তোমার বালতি থেকে তোমার (দ্বীনী) ভাইয়ের বালতিতে পানি ঢেলে দেওয়া তোমার জন্য সাদ্‌কা স্বরূপ।(তিরমিযী: ১৯৫৬)

প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে করণীয়

একটি শিশুর শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা তার মেধা বিকাশে বাধা হতে পারে না, যদি তাকে সঠিক পরিবেশ দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত করতে বিশেষায়িত শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই সুন্নাহর প্রতিফলন, যেখানে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর মতো প্রতিবন্ধী সাহাবীদের সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে ও জ্ঞানচর্চায় সমান সুযোগ প্রদান করেছিলেন।

অনেক সময় উপযুক্ত গাইডলাইনের অভাবে এসব শিশুদের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বাবা-মায়ের উচিত তাদের লোকলজ্জার ভয়ে ঘরবন্দি না রেখে বরং তাদের বিশেষ দক্ষতাকে খুঁজে বের করা। কারণ, মহান আল্লাহ কাউকে অহেতুক সৃষ্টি করেননি; প্রত্যেকের মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ রয়েছে।

শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের হতে হবে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও মমতাশীল। তাদের জন্য আধুনিক শিক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি:

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ” (ইবনে মাজাহ: ২২৪)। এখানে ‘প্রত্যেক’ শব্দের মধ্যে নারী-পুরুষ, সুস্থ-অসুস্থ এবং শারীরিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সবাই অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে মেধা বা শারীরিক সক্ষমতা শিক্ষার শর্ত নয়, বরং মানুষের সদিচ্ছাই মূল। সুতরাং, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে তাদের উপর জুলুম করা।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রতিবন্ধীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা

হালাল উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া প্রতিটি মুমিনের অধিকার ও ইবাদত। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) ভাই-বোনদের কেবল যাকাত বা সদকার ওপর নির্ভরশীল রাখা ইসলামি ইনসাফের পরিপন্থী; বরং তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে কর্মক্ষম করে তোলা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। উপযুক্ত দ্বীনি শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে তারা সমাজের বোঝা নয়, বরং উম্মাহর সম্পদে পরিণত হতে পারেন। সরকারি ও সামাজিক পর্যায়ে তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। যখন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজ হাতে উপার্জিত রিজিকে তুষ্ট হন, তখন তিনি পরিবারের রহমত এবং বরকতের  ছায়া হয়ে ওঠেন। তাদের এই স্বাবলম্বিতা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো জাতির বরকত ও সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় আইন ও সচেতনতা

ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। তাদের অধিকার কোনো মানবসৃষ্ট দয়ার বিষয় নয়, বরং শরিয়াহপ্রদত্ত হক। ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে আল্লাহপ্রদত্ত আমানত হিসেবে গণ্য করে। তাই শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা কাউকে সামাজিক সম্মান, সম্পদ বা নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করার কারণ হতে পারে না।

ইসলামী রাষ্ট্রে শাসকের দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের জান, মাল ও ইজ্জতের হেফাজত করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার এবং বৈধ উপায়ে ব্যবসা বা জীবিকা অর্জনের অধিকার শরিয়াহ দ্বারা স্বীকৃত। কেউ যদি তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করে বা প্রতারণা করে, তবে ক্বাজী বা শরিয়াহ আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। একইভাবে বিবাহের ক্ষেত্রে তাদের সম্মতি ও কল্যাণ বিবেচনা করা ফরজ। জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া বা তাদের অক্ষম ভেবে বিয়ে থেকে বঞ্চিত করা শরিয়াহসম্মত নয়।

যারা কর্মক্ষম নন বা সীমিতভাবে কর্মক্ষম, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। বায়তুল মাল, যাকাত ও সদকার মাধ্যমে তাদের প্রয়োজন পূরণ করা ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইতিহাসে দেখা যায়, খোলাফায়ে রাশেদীন যুগে দুর্বল ও অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত ভাতা নির্ধারণ করা হতো, যাতে তারা সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারেন।

সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেও ইসলাম অত্যন্ত সংবেদনশীল। কাউকে উপহাস করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা বৈষম্য করা হারাম। বরং তাদের সহায়তা করা, চলাচলে সহযোগিতা করা এবং সম্মানজনক ভাষায় সম্বোধন করা ঈমানের দাবি। মসজিদ, মাদরাসা ও পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে এ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে যে প্রতিবন্ধিতা আল্লাহর পরীক্ষা, আর তাদের হক আদায় করা আমাদের দ্বীনি দায়িত্ব।

প্রতিবন্ধী বান্ধব সমাজ গঠনে আমাদের করণীয় ও মানসিক সমর্থন

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা প্রতিবন্ধী বান্ধব সমাজ গড়ে তোলা কেবল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়, বরং এটি আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক ও সামাজিক কর্তব্য। প্রথমত, আমাদের পরিকাঠামো বা অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন। তবে অবকাঠামোর চেয়েও বেশি প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। এই লক্ষ্যেই আল-আনকাবুত ফাউন্ডেশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।প্রতিবন্ধীদের করুণার পাত্র না ভেবে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই হলো আসল মানসিক সমর্থন। ফাউন্ডেশনটি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। এছাড়া পরিবার ও সমাজ থেকে নিরবচ্ছিন্ন মানসিক সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা,  তাদেরকে সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা এবনং অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। যখন আমরা তাদের সীমাবদ্ধতাকে নয়, বরং তাদের সুপ্ত সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেব, তখনই একটি প্রকৃত বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে। আল-আনকাবুত ফাউন্ডেশন প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদের পাশে থেকে একটি মানবিক ও সাম্যবাদী পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখে। আরও পড়ুন