বারসিসার কাহিনী: শয়তানের কৌশল ও মানব জীবনের শিক্ষা

ইবাদত, ইমান, তাকওয়া ও ধর্মীয় জ্ঞানের উচ্চতায় পৌঁছালেই কি মানুষ নিরাপদ হয়ে যায়? নাকি আত্মতুষ্টি আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তখন সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? বনী ঈসরাইলের বিখ্যাত উপাসক বারসিসার কাহিনী আমাদের সামনে এই কঠিন প্রশ্নটাই তুলে ধরে। একজন আজীবন ইবাদতকারী মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে, প্রায় অদৃশ্য কিছু ধাপ পেরিয়ে শয়তানের ফাঁদে পড়ে ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়িয়ে যায়, এই কাহিনী তার বাস্তব উদাহরণ। বারসিসার ঘটনা আমাদের শেখায়, শয়তান কখনো হঠাৎ আঘাত করে না; সে অপেক্ষা করে, সুযোগ খোঁজে, আর “ভালো কাজ” ও “ভালো উদ্দেশ্য”-এর আড়ালে মানুষকে সরল পথ থেকে সামান্য সরিয়ে দেয়, যার শেষটা হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস।

বারসিসা (রহ.)–এর করুণ কাহিনী

বারসিসা ছিল বনী ঈসরাইলের একজন সুখ্যাত উপাসক, ধর্মযাজক, ‘আবিদ’। তার নিজের উপাসনালয় ছিল। আর সেখানে সে একাগ্রভাবে নিজেকে উপাসনায় নিয়োগ করত।

বনী ঈসরাইলের তিনজন পুরুষ জিহাদে যেতে চাচ্ছিল, তাদের একমাত্র বোনকে কোথায় রেখে যাবে বুঝতে পারছিল না। তারা সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘কোথায় আমরা আমাদের বোনকে রেখে যেতে পারি? তাকে তো আমরা একা ফেলে যেতে পারিনা। কোথায় তাকে রেখে যাওয়া যায়?’ তখন তারা তাদেরকে বলল, ‘তাকে রেখে যাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হবে তাকে ঐ উপাসকের কাছে রেখে যাওয়া, সেই-ই সবচেয়ে ধার্মিক ব্যক্তি, আর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। তোমাদের বোনকে তার কাছে রেখে যাও, সে তার খেয়াল রাখবে।’ তারা আবিদের নিকট গেল। তাকে সব বর্ণনা করে বলল, ‘এই হল অবস্থা, আমরা জিহাদে যেতে চাই, আপনি কি কষ্ট করে আমাদের বোনকে দেখে রাখতে পারবেন?’ সে বলল, ‘আমি তোমাদের থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমার কাছ থেকে চলে যাও।’

তখন শয়তান তাকে প্রলুব্ধ করল, ‘তুমি তাকে কার কাছে রেখে আসবে? তুমি যদি তার খেয়াল না রাখো তাহলে হয়ত কোন দুষ্ট লোক তার খেয়াল রাখবে, আর তারপর তো তুমি জানোই কী ঘটবে! তুমি কি করে এই ভাল কাজটা তোমার হাতছাড়া করে দিতে পার?’

দেখুন! শয়তান তাকে ভাল কাজে উৎসাহিত করছে! তো সে তাদেরকে আবার ডেকে এনে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি তার খেয়াল রাখব, কিন্তু সে আমার সাথে আমার উপাসনালয়ে থাকতে পারবে না, আমার আরেকটা বাড়ি আছে সে সেই ঘরে থাকবে।’

সে মেয়েটিকে বলল, ‘তুমি ওখানে থাক, আমি আমার উপাসনালয়ে থাকব।’

তো মেয়েটা সেই বাড়িতে একটা ঘরে থাকত, আর সেই ধর্মযাজক তার জন্য প্রতিদিন খাবার নিয়ে এসে তার নিজের দরজার বাইরে রেখে দিত। সে মেয়েটির বাড়িতে পর্যন্ত যেত না, নিজের দরজার বাইরেই খাবার রেখে দিত আর মেয়েটিকে ঘর থেকে বের হয়ে এসে খাবার নিয়ে যেতে হত; সে মেয়েটির দিতে তাকিয়ে দেখতে পর্যন্তও চাইত না।

তখন শয়তান আবার তার কাছে এসে বলল, ‘তুমি করছটা কি? তুমি কি জানো না মেয়েটা যখন তার ঘর থেকে বের হবে আর তোমার উপাসনালয় পর্যন্ত আসবে লোকে তাকে দেখতে পাবে? তোমার উচিত তার দরজায় যেয়ে খাবারটা রেখে আসা।’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, আসলেই!’

শয়তান কিন্তু তার সাথে সামনা-সামনি কথা বলছেনা, তাকে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। ধর্মযাজক ‘আবিদ তাই এবার খাবার নিয়ে মেয়েটির দরজা পর্যন্ত রেখে আসতে শুরু করল।

এভাবে কিছুদিন চলল, এরপর শয়তান তাকে বলল, ‘মেয়েটা এখনও তার দরজা খুলছে আর বাইরে বের হয়ে আসছে প্লেট নেয়ার জন্য, কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে, তোমার উচিত প্লেটটা তার ঘরে গিয়ে দিয়ে আসা।’ শয়তান কিনা তাকে বলছে আরো ভাল কাজ করতে! তাই সে খাবারের প্লেটটা ঘরে রাখা আরম্ভ করল, সেখানে রেখেই সে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসত। এভাবে আরো কিছুদিন পার হলো। আর ওদিকে জিহাদ চলতে থাকায় ভাইদের ফিরে আসতে বিলম্ব হচ্ছিল।

শয়তান আবারো তার কাছে আসলো। বলল, ‘আচ্ছা, তুমি তাকে এভাবে একা ছেড়ে দিবে, কেউ তো নেই যে তার দিকে একটু খেয়াল রাখবে, একটু কথা বলবে। সে যেন জেলখানায় আবদ্ধ হয়ে আছে, কথা বলার কেউ নেই। তুমি কেন ওর দায়িত্ব নিচ্ছ না? ওর সাথে একটু সামাজিকতা বজায় রেখে তো চলতে পারো, গিয়ে একটু কথা বলো যাতে করে তুমি তার খোঁজখবর রাখতে পারো। তা না হলে দেখা যাবে সে বাইরে যেয়ে কোন পরপুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে।’ তাই সে মেয়েটির সাথে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করলো, মেয়েটা ঘরের মধ্য থেকেই কথা বলত; দুজনকে প্রায় চিৎকার করে কথা বলতে হতো যেন তারা একজন অন্য জনকে শুনতে পায়।

শয়তান এবার তাকে বলল, ‘এরকম দূর থেকে একজন আরেকজনের উপর চিৎকার না করে কেন ব্যাপারটাকে নিজের জন্য আরেকটু সুবিধাজনক করে নিচ্ছোনা? কেন তার সাথে একই ঘরে বসে কথা বলছ না?’ তো এবার সে মেয়েটার সাথে একই ঘরে বসে কিছুসময় ব্যয় করতে শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসাথে কাটাতে লাগল, আর আস্তে আস্তে তারা পরস্পরের আরো কাছাকাছি আসতে লাগল। এক সময় এমন হল যখন সেই আবিদ, ধর্মযাজক, উপাসক সেই মেয়ের সাথে যিনায় (ব্যাভিচার) লিপ্ত হল। ফলে মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ল।

কাহিনী এখানেই শেষ নয়। মেয়েটি একটি সন্তানের জন্ম দিল। শয়তান ধর্মযাজকের কাছে এসে বলল, ‘একি করেছ তুমি! তুমি কি জানো যখন ওর ভাইরা ফিরে আসবে তখন কি হবে? তারা তোমাকে মেরে ফেলবে, এমনকি তুমি যদি এটাও বলো যে– “এটা আমার বাচ্চা না”, তারা তোমাকে বলবে যে, “তোমার বাচ্চা না হলেও তুমি তার দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলে, তাই এটা এখন তোমারই দায়ভার। বাচ্চার বাবা কে আমরা তার পরোয়া করি না, তুমিই এর জন্য দায়ী।” সুতরাং এখন একটাই উপায়, তুমি বাচ্চাটাকে মেরে তাকে পুঁতে ফেল।’ বারসিসা বলল, ‘এটা কি গোপন থাকবে আমি তার ছেলেকে মেরে ফেলার পরে?’ শয়তান বলল, ‘তোমার কি মনে হয় ও এটাকে গোপনে রাখবে? তুমি যদি এরকম ভাব, তাহলে তুমি মস্ত বড় বোকা।’ সে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে আমি কি করব?’ শয়তান জবাব দিল, ‘তোমার ঐ মেয়েটাকেও মেরে ফেলা উচিত।’ তাই সে মেয়েটাকে আর বাচ্চাকে মেরে ফেলল, এরপর দুজনকে একই ঘরের নিচে কবর দিয়ে দিল।

ভাইয়েরা একসময় ফিরে আসল, তারপর জানতে চাইল, ‘আমাদের বোন কোথায়?’ সে উত্তরে বলল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এরপর মারা যায়, তাকে ওখানে কবর দেয়া হয়েছে’- এই বলে সে মনগড়া একটা কবর দেখিয়ে দিল তাদেরকে। তারা বলে উঠল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহিরাজি’উন’, তারা বোনের জন্য দু’আ করলো, আর নিজেদের বাসায় ফিরে গেল।

রাতের বেলা, তিনজনের মাঝে এক ভাই একটা স্বপ্ন দেখলো, কে তার সেই স্বপ্নে এসেছিল? শয়তান! সে তাকে বলল, ‘তুমি বারসিসাকে বিশ্বাস করো? তুমি কি তাকে বিশ্বাস করো? সে মিথ্যা বলেছে। সে তোমার বোনের সাথে ব্যাভিচার করেছে, তারপর তাকে আর তার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আর এই কথার প্রমাণ হল সে তোমাদেরকে যেখানে কবর দেখিয়েছে তোমাদের বোন সেখানে নেই, আছে তার ঘরের পাথরের নিচে।’ তার ঘুম ভেঙ্গে গেল আর সে তার বাকি ভাইদেরকে স্বপ্নের কথা জানালো। তারা বলল, ‘আমরাও তো একই স্বপ্নই দেখেছি, তাহলে এটা নিশ্চয়ই সত্যি’। পরদিন তারা সেই মিথ্যা কবরটা খুড়ল কিন্তু কিছুই পেল না, এরপর তারা তাদের বোনের ঘরে গিয়ে মাটি সরাল তখন দেখতে পেল তার বোনের মৃতদেহ, সাথে একটা শিশু। তারা যেয়ে বারসিসাকে ধরল, ‘মিথ্যুক! এইসব করেছ তুমি?’ তারা তাকে ধরে টেনে হিঁচড়ে রাজার কাছে নিয়ে গেল।

এমন সময় শয়তান আসল বারসিসার কাছে, এবার কিন্তু সে মনের ওয়াসওয়াসা হিসেবে আসেনি, সে আসল মানুষের রূপ ধরে। তাকে বলল, ‘বারসিসা, তুমি কি জানো আমি কে? আমি শয়তান, আমিই সে, যে তোমাকে এতো ঝামেলার মধ্যে ফেলেছি। আর আমিই সে একজন, যে তোমাকে এখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবো। আমিই এসব ঘটনা ঘটিয়েছি আর আমার কাছেই আছে এসবের সমাধান। এখন তোমার উপর নির্ভর করে, তুমি যদি মরতে চাও তো ঠিক আছে। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে রক্ষা করি, তাহলে আমি করতে পারি।’ বারসিসা বলল, ‘দয়া করে আমাকে বাঁচাও।’ শয়তান বলল, “আমাকে সিজদাহ করো।” বারসিসা শয়তানের প্রতি সিজদাহ করল। কিন্তু শয়তান কি বললো? সে বললো, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, তোমার সাথে দেখা হয়ে ভাল লাগল।’ এরপর সে তাকে আর কোনদিন দেখতে পেল না। বারসিসা শয়তানের উদ্দেশ্যে সিজদাহ করলো, আর এটাই ছিল তার জীবনে করা শেষ কাজ, কারণ এর কিছুক্ষণ পরেই তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সুতরাং তার জীবনের শেষ কাজটা তাহলে ছিল- শয়তানকে সিজদাহ করা, সে ছিল সেই উপাসক যে কিনা ছিল সরল পথের উপর, কিন্তু যেহেতু সে সেপথ থেকে বাঁক নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যদিও খুব খুব ছোট্ট একটা বাঁক, প্রথমদিকে যেটাকে একেবারেই তুচ্ছ মনে হচ্ছিল, একটু সুবিধার নামে, দ্বীনের মাসআলার নামেই সে এগুলো করেছিল। সরলপথ থেকে তার বিচ্যুতির পরিমাপটা ছিল একদমই নগণ্য কিন্তু দেখুন তার শেষ পরিণতি! নিজের ইচ্ছাকে অনুসরণ করার বিপত্তিটা এখানেই; আমরা আমাদের জ্ঞান, কোরআনের যতখানি জানি, আমাদের ইবাদত ইত্যাদি নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে যাই। সুবহানাল্লাহ! আমাদের তো সব সময় উচিত নিজেদের নিয়ে শঙ্কায় থাকা, আমরা কখনই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হবো না বরং আমাদের সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতে হবে, আর এটাই হল আল্লাহ-ভীতি, এটাই সত্যিকার অর্থে ‘জ্ঞান’।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

“অনুরূপ ভাবে বিভিন্ন বর্ণের মানুষ, জন্তু, চতুস্পদ প্রাণী রয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়।” (সূরা ফাতির, ৩৫:২৮)

এই আয়াত আমাদের একটি গভীর সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইসলামে জ্ঞান মানেই কেবল তথ্য জানা নয়; বরং সেই জ্ঞান থেকে আল্লাহভীতি ও আত্মসংযম জন্ম নেওয়া। জ্ঞান যদি হৃদয়ে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি না করে, তবে সেই জ্ঞান মানুষকে রক্ষা করার বদলে কখনো কখনো বিভ্রান্তির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বারসিসা (রহ.)–এর কাহিনী আমাদের জন্য এক শক্তিশালী শিক্ষা। আসুন, এই কাহিনী থেকে আমরা কী কী উপলব্ধি ও সতর্কবার্তা গ্রহণ করতে পারি, সেগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুধাবন করি।

শয়তানের ধাপে ধাপে আক্রমণ: বারসিসা ও ইমাম আহমেদের শিক্ষা

প্রথমেই আমাদের গভীরভাবে লক্ষ্য করা দরকার শয়তান বারসিসার সাথে কোন কৌশল গ্রহণ করেছিল। সে কখনোই সরাসরি এসে বলেনি, “আমাকে সিজদাহ করো।” কারণ শয়তান জানত, এমন সরাসরি আহ্বান বারসিসা কখনোই গ্রহণ করত না। বরং সে গ্রহণ করেছিল ধাপে ধাপে পথভ্রষ্ট করার নীতি একটি কাজের মাধ্যমে আরেকটির দরজা খুলে দেওয়া। এটাই শয়তানের চিরন্তন পদ্ধতি।

শয়তানের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করা, ঈমান থেকে বিচ্যুত করা এবং শেষপর্যন্ত শিরক ও কুফরের অবস্থায় মৃত্যু নিশ্চিত করা। বারসিসার করুণ পরিণতি আমাদের সামনে এই বাস্তবতাকেই উন্মোচন করে। সুবহানাল্লাহ!

এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলের (রহ.) মৃত্যুকালীন ঘটনাটি গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ (রহ.) বর্ণনা করেন- মৃত্যুশয্যায় অচেতন অবস্থায় ইমাম আহমদ বারবার বলছিলেন, “লা বা‘আদ, লা বা‘আদ”, অর্থাৎ, “না, এখনও নয়।” স্বাভাবিকভাবেই এই কথা শুনে তাঁর পুত্র ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল, যেন তিনি মৃত্যুকে প্রত্যাখ্যান করছেন।

কিন্তু জ্ঞান ফিরে এলে ইমাম আহমদ (রহ.) ব্যাখ্যা করেন- শয়তান তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে বিজয়ের ভঙ্গিতে বলছিল, “হে আহমদ, তুমি আমার হাত থেকে বেরিয়ে গেলে!” তখন তিনি উত্তর দিচ্ছিলেন, “না, এখনও নয়। যতক্ষণ না আমি মৃত্যুবরণ করছি, ততক্ষণ আমাদের লড়াই শেষ হয়নি।”

ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, শয়তান জানে মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তই তার জন্য শেষ সুযোগ। যদি সে তখন ব্যর্থ হয়, তবে চিরকালের জন্য পরাজিত হয়। তাই মৃত্যুর আগমুহূর্তে শয়তান তার সব শক্তি নিয়োগ করে। এই বাস্তবতা আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় শয়তান আমাদের পেছনে কতটা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। আল্লাহ যেন আমাদের এই উপলব্ধি দান করেন।

নারী ফিতনা: কোরআন-হাদিসের আলোকে বাস্তব উপলব্ধি

বারসিসার কাহিনী থেকে যে শিক্ষা প্রথমে চোখে পড়ে, তা হলো নারী ফিতনার বাস্তবতা। এই বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে রাসূল ﷺ- এর সতর্কবাণী স্মরণ করা জরুরি। তিনি বলেছেন,

“অবশ্যই দুনিয়াটা চাকচিক্যময় মিষ্টি ফলের মতো আকর্ষণীয়। আল্লাহ তা’আলা সেখানে তোমাদেরকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। তিনি লক্ষ্য করতেছেন যে, তোমরা কিভাবে কাজ করো। তোমরা দুনিয়া ও নারী জাতি থেকে সতর্ক থেকো। কেননা বনী ইসরাঈলদের মাঝে প্রথম ফিতনাহ নারীকেন্দ্রিক ছিল।” (সহীহ মুসলিম: ২৭৪২)

আরেক হাদিসে আছে,

উমার (রাঃ) জাবিয়াতে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই জায়গায় আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছেনঃ আমার সাহাবীদের জন্য সব সময় শুভ কামনা কর, তারপর তাদের পরবর্তীদের জন্য, তারপর তাদের পরবর্তীদের জন্য। এরপর মিথ্যা ছড়িয়ে পড়বে, এমনকি এমনও ঘটবে যে, কোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করার আগেই সে সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জান্নাতের মাঝখানে থাকতে ইচ্ছুক, সে যেন অবশ্যই জামাতবদ্ধ জীবন যাপন করে। কেননা শয়তান একাকী মানুষের সঙ্গী এবং দু’জন থেকে সে অপেক্ষাকৃত দূরে থাকে। তোমাদের কেউ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ না করে। কেননা সে সময় শয়তান হয় তৃতীয় জন। আর নিজের সৎকাজ যাকে আনন্দ দেয় এবং নিজের মন্দ কাজ যাকে দুঃখ দেয়, সেই প্রকৃত মুমিন।

এগুলো কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়; বরং মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতার বাস্তব বর্ণনা।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলে-,

“আল্লাহ তোমাদের ভার লঘু করতে চান, কারণ মানুষকে দুর্বলরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।” (সূরা নিসা: ২৮)

এই দুর্বলতার তাফসীরে স্পষ্টভাবে নারীর প্রতি আকর্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের মনকে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি মোহগ্রস্ত করে তার তালিকায় প্রথমেই নারীর কথা উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন- 

“মানুষের জন্য ওই সকল বস্তুর আসক্তিকে মনোরম করা হয়েছে, যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক অর্থাৎ নারী, সন্তান, রাশিকৃত সোনা-রুপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার। এসব ইহ-জীবনের ভোগ-সামগ্রী। (কিন্তু) স্থায়ী পরিণামের সৌন্দর্য কেবল আল্লাহরই কাছে।” (সূরা আলে ইমরান: ১৪)

এখানে ইসলাম নারীকে দোষারোপ করেনি; বরং পুরুষের দায়িত্ববোধ ও আত্মসংযমের বিষয়টি সামনে এনেছে। যে ব্যক্তি নিজের নফস ও দৃষ্টিকে সংযত করতে পারে না, তার জন্য এই ফিতনা সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। বারসিসার কাহিনী আমাদেরকে এই সতর্কবার্তাই দেয়।

ভালো উদ্দেশ্য’ নামের শয়তানি ফাঁদ ও দাওয়াহর সীমারেখা

বারসিসার কাহিনী থেকে আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ভালো উদ্দেশ্যের নামে শয়তানের ফাঁদ। শয়তান কখনো সরাসরি পাপে আহ্বান করে না; বরং বলে, “তুমি তো ভালো কাজই করছ।”

বারসিসার ক্ষেত্রেও শয়তান বারবার তাকে মেয়েটির “কল্যাণের” কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এই ওয়াসওয়াসার প্রতিটিতেই বারসিসা পা দিয়েছে এবং এক পর্যায়ে তার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছে।

আজও আমরা এই একই প্রবণতা দেখি। অনেকেই নিজে ঠিকভাবে ইসলাম শেখার ও মানার আগেই দাওয়াহর ময়দানে নেমে পড়ে। অথচ দাওয়াহর সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে নিজেকে রক্ষা করা তার অন্যতম।

বিশেষ করে অনলাইন জগতে এই ফাঁদ আরো ভয়ংকর। নন-মাহরামের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন, ফান পোস্টে আবেগঘন মন্তব্য, সমান তালে রেসপন্স সবই শয়তানের সাজানো পথ। শুরুতে নিরীহ মনে হলেও, ধীরে ধীরে সম্পর্ক, অনুভূতি এবং শেষ পর্যন্ত হারামের দিকে গড়িয়ে যায়।

মনে রাখতে হবে, সবাইকে দাওয়াহ দেওয়ার দায়িত্ব আপনার উপর নয়। কিন্তু নিজের ঈমান ও তাক্বওয়া রক্ষা করার দায়িত্ব অবশ্যই আপনার উপর। শয়তান যার দিকে আপনাকে আকৃষ্ট করছে, তার দিকে দাওয়াহর অজুহাতে এগিয়ে যাওয়া আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।

একাকীত্বের বিপদ, আত্মশুদ্ধি ও চূড়ান্ত উপলব্ধি

বারসিসার কাহিনী থেকে শেষ যে বড় শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো- বৈরাগ্য ও একাকীত্বের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হওয়া। একাকীত্ব শয়তানের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র। পরিবার, সামাজিক দায়িত্ব ও সুস্থ সম্পর্ক মানুষকে বহু ফিতনা থেকে রক্ষা করে।

একটি গভীর কথা রয়েছে, “আপনি একা থাকলে যা করেন, সেটাই আপনার প্রকৃত চরিত্র।” ইসলামি চিন্তাবিদগণ প্রায়ই বলেন, “গোপন জীবনের ইবাদত মানুষকে জান্নাতের পথে এগিয়ে নেয়, আর গোপন জীবনের গুনাহ মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।” একাকীত্বে শয়তানের ওয়াসওয়াসা সবচেয়ে বেশি কাজ করে এবং সহজেই তাক্বওয়ার স্তর নামিয়ে আনে।

এই লেখায় ইন্টারনেট জগতের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে শুধু বোঝার সুবিধার্থে। মূল সমস্যা হলো আমরা ইসলামকে জানার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখছি, উপলব্ধি ও আমলের পর্যায়ে নিচ্ছি না। তাই অনেক জ্ঞানী মানুষকেও দেখা যায় জ্ঞান আছে, কিন্তু জীবনে তার প্রতিফলন নেই।

বারসিসার কাহিনী হয়তো আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু নতুন করে ভাবি না। অথচ এই কাহিনী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আত্মশুদ্ধির জন্য এক শক্তিশালী রিমাইন্ডার হতে পারে। ভুল হলে আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব, অনুতপ্ত হব, এটাই মুমিনের পরিচয়।

আল্লাহ আমাদের ভুলগুলো ক্ষমা করুন, উপলব্ধিকে আমলে রূপ দেওয়ার তৌফিক দিন এবং আমাদেরকে সরল পথে অবিচল রাখুন। ইহ্‌দিনাস সিরাত্বাল মুস্তাকিম, আমীন।  আরও পড়ুন

Leave a Reply