
পবিত্র কুরআন কেবল তিলাওয়াত বা ইবাদতের কিতাব নয়, বরং এটি মানবজীবনের প্রতিটি বাঁকে আলোর দিশারি। বিশেষ করে মানুষের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ, সামাজিক শিষ্টাচার, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য সূরা আল-হুজুরাত এক অনন্য সংবিধান। বর্তমান সময়ে যখন সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্য, অহেতুক বিতর্ক, গিবত (পরনিন্দা) এবং অহংকার আমাদের সামাজিক ও আত্মিক জীবনকে কলুষিত করছে, তখন এই সূরার শিক্ষা আমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন মুমিন হিসেবে কথা বলার আদব কেমন হবে, মতভেদ কীভাবে নিরসন করতে হবে, গুজবের ভয়াবহতা থেকে বাঁচার উপায় কী এবং সর্বোপরি একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে আমাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত—আল্লাহ তাআলা এই সূরায় অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তা বর্ণনা করেছেন। তাই এই সূরাকে আমরা একটি ‘আদর্শ নাগরিক ও সামাজিক নীতিমালা’ হিসেবে গণ্য করতে পারি।
শিষ্টাচার ও নেতৃত্বের প্রতি আদব: দ্বীনি জীবনের ভিত্তি
সূরা আল-হুজুরাতের প্রারম্ভিক আয়াতগুলো মুমিনদের জন্য এক “আধ্যাত্মিক প্রটোকল” বা শিষ্টাচারের নীতিমালা হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য কেবল নিয়ত শুদ্ধ হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং নবীর আদর্শ এবং নেতৃত্বের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করাও অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। মুমিনগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১-২)
এই আয়াতে ‘অগ্রণী না হওয়া’ মানে হলো- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনার ওপর নিজের যুক্তি, বুদ্ধি বা আবেগকে প্রাধান্য না দেওয়া। সাহাবায়ে কেরাম এই আয়াতের পর এতটাই সতর্ক হয়েছিলেন যে, তারা রাসূল ﷺ-এর সামনে খুব নিচু স্বরে কথা বলতেন, যেন তাদের আমলগুলো অজান্তেই নষ্ট না হয়ে যায়। আজকের ডিজিটাল যুগে এবং সামাজিক বাস্তবতায় এই আদব বা শিষ্টাচারের শিক্ষাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
- পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা: পরিবারে মুরুব্বি এবং সমাজে যোগ্য ও নেককার নেতৃত্বের সামনে উচ্চবাচ্য করা বা তাদের সিদ্ধান্তকে তুচ্ছজ্ঞান করা সুশৃঙ্খল সমাজের পরিপন্থী। ইসলাম অনুযায়ী জ্ঞানী এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে বিনয়ী থাকা ইবাদতেরই অংশ।
- শিক্ষক ও ওলামায়ে কেরামের সম্মান: দ্বীনি বা দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জনের প্রথম শর্ত হলো শিক্ষকের প্রতি আদব। বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় গঠনমূলক সমালোচনার নামে আমরা অনেক সময় শিক্ষক বা আলেমদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করি, যা আমাদের আত্মিক বরকত কমিয়ে দেয়।
- নিজস্ব মতামতের নিয়ন্ত্রণ: কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজের জেদ বা ‘আমিই সেরা’ এই মানসিকতা পরিহার করে কুরআন-সুন্নাহ এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই সূরার মূল শিক্ষা।
গুজব ও সত্যতা যাচাই: সূরা আল-হুজুরাতের শিক্ষা
আজকের সোশ্যাল মিডিয়া কালচারে আমরা যাচাই না করেই কোনো খবর শেয়ার করি, যা অনেক সময় গুজব হয়ে অন্যের জীবন বিপন্ন করে তোলে। আবার ইনবক্স বা কমেন্ট সেকশনে আমরা খুব সহজেই অন্যের অগোচরে তার গিবত বা গীবতে লিপ্ত হই। পবিত্র কুরআন এই হীন কাজটিকে “মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া”র মতো জঘন্য অপরাধের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ইসলাম অনুসারে মুমিনের কাজ হলো কারো ভুল দেখলে তা তাকে সংশোধনের জন্য সরাসরি জানানো, আড়ালে নেতিবাচক প্রচার না করা। গুজব ছড়িয়ে ফিতনা সৃষ্টি করা এবং গিবত করে কারো সম্মান নষ্ট করা উভয়ই সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করে। সুতরাং, জিহ্বা ও কি-বোর্ডের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই একটি আদর্শ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব।
আমাদের শেখায় যে, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের প্রধান অন্তরায় হলো তথ্যের অপব্যবহার এবং অন্যের আড়ালে তার দোষ চর্চা করা। এই সূরায় আল্লাহ তাআলা গুজব এবং গিবত উভয়টিকেই ঈমানি পরিপন্থী কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
সূরা আল-হুজুরাতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
“মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।” (সূরা আল-হুজুরাত: ০৬)
“হে মু’মিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা হতে বিরত থাক। কতক ধারণা পাপের অন্তর্ভুক্ত। তোমরা অন্যের দোষ খোঁজাখুঁজি করো না, একে অন্যের অনুপস্থিতিতে দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো সেটাকে ঘৃণাই করে থাক। আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ খুব বেশি তাওবাহ ক্ববূলকারী, অতি দয়ালু।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক ঐক্য: বিভেদ নিরসনে ইসলামের ভূমিকা
সূরা আল-হুজুরাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো মুসলিম উম্মাহর অখণ্ডতা রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা এখানে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে কেবল বন্ধুত্বের নয়, বরং ‘রক্তের সম্পর্কের’ ভাইদের মতো ঘোষণা করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
“নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১০)
বর্তমান সময়ে আমরা সামান্য মতভেদ, রাজনৈতিক আদর্শ, মসজিদ কমিটি বা পারিবারিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিবাদে লিপ্ত হই। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে আক্রমণ করা আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিবাদে লিপ্ত হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
ইসলাম বলে ‘Unity is mandatory, ego is optional’। অর্থাৎ ঐক্য বজায় রাখা ফরজ বা আবশ্যিক, আর নিজের অহংকার বা ইগো বিসর্জন দেওয়া ঐচ্ছিক ও প্রশংসনীয়। একজন প্রকৃত মুসলিমের কাজ সমাজকে ভেঙে টুকরো করা নয়, বরং যেখানে ফাটল ধরেছে সেখানে সমঝোতার সেতু তৈরি করা। যখন দুজন মুসলিম বা দুটি দলের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়, তখন বাকিদের দায়িত্ব হলো পক্ষপাতিত্ব না করে ন্যায়ের সাথে তা মিটিয়ে দেওয়া। এই সামাজিক সংহতিই একটি জাতিকে শক্তিশালী করে তোলে এবং আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করে।
সামাজিক ব্যাধি বর্জন: চারিত্রিক শুদ্ধি ও আত্মমর্যাদার সুরক্ষা
আল্লাহ তাআলা এমন কিছু সামাজিক ব্যাধিকে চিহ্নিত করেছেন যা সমাজের শান্তি ও ব্যক্তির আমল উভয়কেই ধ্বংস করে দেয়।
আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“হে মু’মিনগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরা যেন অন্য নারীদেরক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারিণীদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অন্যের নিন্দা করো না, একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর (ঈমানের আগে কৃত অপরাধকে যা মনে করিয়ে দেয় সেই) মন্দ নাম কতই না মন্দ! (এ সব হতে) যারা তাওবাহ না করে তারাই যালিম।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১১)
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া ও দৈনন্দিন আড্ডার সংস্কৃতিতে আমরা এই নিষিদ্ধ কাজগুলোকে বিনোদনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছি। অথচ এর প্রতিটি পর্যায় অত্যন্ত ভয়াবহ:
- উপহাস ও মন্দ উপাধি: ফেসবুকে কাউকে নিয়ে ‘ট্রল’ করা বা অপমানজনক নিকনেম (Nickname) দেওয়া আজ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কাউকে ছোট করা এবং নিজের অহংকার প্রকাশ করা, ঈমানের পরিপন্থী।
- সন্দেহ ও গোপন দোষ খোঁজা: অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁত বের করার জন্য আমরা গোয়েন্দাগিরি করি। অথচ ইসলাম আমাদের শিখায় অন্যের দোষ গোপন রাখতে, যাতে আল্লাহ কিয়ামতের দিন আমাদের দোষ গোপন রাখেন।
- গিবত বা পরনিন্দা: গিবতকে কুরআন “মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া”র সাথে তুলনা করেছে, যা ভাবলেই আমাদের গা শিউরে ওঠা উচিত। অথচ আমরা ধর্মীয় আলোচনার ছদ্মবেশেও অনেক সময় অন্যের গিবত করে ফেলি।
জিহ্বার নিয়ন্ত্রণই হলো প্রকৃত তাকওয়ার প্রমাণ। একজন মুমিন অন্যের দোষ খোঁজার আগে নিজের ত্রুটি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। নিজের কি-বোর্ড এবং কণ্ঠস্বরকে অন্যের সম্মান রক্ষার কাজে ব্যবহার করাই হলো একজন মুমিনের ইমানের দাবি।
তাকওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি
সমকালীন বিশ্বে যখন বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং আভিজাত্যের দম্ভ চরম আকার ধারণ করেছে, তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে শ্রেষ্ঠত্বের এক বৈপ্লবিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের গায়ের রং, ভাষা, বংশ বা ভৌগোলিক পরিচয় তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়; বরং আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান, যার অন্তরে রয়েছে গভীর আল্লাহভীতি বা তাকওয়া। এই নীতি কেবল ব্যক্তির আত্মিক উন্নয়ন ঘটায় না, বরং সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ইনসাফ কায়েম করে। মূলত তাকওয়ার এই মানদণ্ডই মানুষকে প্রকৃত মানবিক মর্যাদায় আসীন করে এবং একটি অহংকারমুক্ত বিশ্ব সমাজ গঠনের পথ দেখায়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:
“হে মানুষ! তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
আমাদের জন্য শিক্ষা
- বৈশ্বিক সাম্য ও বর্ণবাদ নির্মূল: ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছে যে গায়ের রং, ভাষা, দেশ বা গোত্র কেবল মানুষের পরিচয়ের মাধ্যম, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। সাদা বা কালোর ব্যবধান কিংবা ধনী-দরিদ্রের প্রাচীর আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে কোনো বাধা হতে পারে না।
- আভিজাত্যের দম্ভ বর্জন: উচ্চবংশ বা আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা ইসলামে এক প্রকার মানসিক ব্যাধি। আল্লাহর আদালতে বংশীয় পরিচয় নয়, বরং মানুষের আমলনামা ও অন্তরের পবিত্রতাই(তাকওয়া) হবে বিচারের মানদণ্ড।
- তাকওয়াই প্রকৃত আভিজাত্য: একজন অতি সাধারণ বা দরিদ্র মানুষ যদি আল্লাহকে ভয় করে চলেন, তবে তিনি আল্লাহর কাছে সেই ক্ষমতাধর বা ধনী ব্যক্তির চেয়েও বেশি সম্মানিত, যার অন্তরে তাকওয়া নেই। সম্মান কোনো অর্জিত পদবি নয়, বরং এটি হৃদয়ের শুদ্ধতার প্রতিফলন।
- সামাজিক মর্যাদা ও ইনসাফ: এই শিক্ষাটি আমাদের সমাজকে শেখায় মানুষকে তার বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে বিচার না করে তার নৈতিক চরিত্র ও আদর্শ দিয়ে মূল্যায়ন করতে। এটিই প্রকৃত মানবিক মর্যাদার মূল ভিত্তি।
ঈমান: আত্মোপলব্ধির চরম শিখর
সূরা আল-হুজুরাতের সমাপ্তি ঘটেছে ঈমান ও ইসলামের সংজ্ঞার এক গভীর পার্থক্যের মধ্য দিয়ে। এখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ঈমান কেবল কিছু বুলি আওড়ানো বা বংশগত পরিচয়ের নাম নয়; বরং এটি হৃদয়ের এক সুদৃঢ় বিশ্বাস যা মানুষের কর্মে প্রতিফলিত হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:
“বেদুঈনরা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’। বল- ‘তোমরা ঈমান আননি, বরং তোমরা বল, ‘আমরা (মৌখিক) আনুগত্য স্বীকার করেছি’, এখন পর্যন্ত তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি। তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে মান্য কর তাহলে তোমাদের কৃতকর্মের কিছুই কমতি করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৪)
মুমিনদের জন্য শিক্ষা:
- পরিচয় বনাম আমানত: আমরা অনেকেই মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়ে বা কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদত করেই নিজেকে পূর্ণ মুমিন মনে করি। কিন্তু ইসলাম শুধু একটি “পরিচয়” নয়, এটি একটি “আমানত” যা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
- ঈমানের প্রতিফলন আচরণে: প্রকৃত ঈমান কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের লেনদেনে, সততায় এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধে প্রকাশিত হয়। যার আচরণে মানুষের নিরাপত্তা নেই, তার ঈমানের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ।
- আত্মতুষ্টির ঊর্ধ্বে তাকওয়া: “আমি অনেক বড় মুসলিম” এই জাতীয় অহংকার বা আত্মতুষ্টির চেয়ে নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং তা সংশোধন করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ঈমান যখন হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন মানুষ বিনয়ী ও ত্যাগী হয়ে ওঠে।
- ঈমানের পরীক্ষা ও ধৈর্য: আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে বলেছেন,“মু’মিন তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর কোনরূপ সন্দেহ করে না, আর তাদের মাল দিয়ে ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে; তারাই সত্যবাদী।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৫)
মুখে নয়, কর্মে ও হৃদয়ে ইসলামকে ধারণ করাই হলো পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথ।
উপসংহার: একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ গঠনের অঙ্গিকার
সূরা আল-হুজুরাত কেবল আল-কুরআনের একটি সূরা নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন ‘নৈতিক ইশতেহার’। একজন মুমিনের ব্যক্তিগত পবিত্রতা থেকে শুরু করে সামাজিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সংহতি প্রতিটি বিষয়ের চূড়ান্ত সমাধান এই সূরায় নিহিত। এটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ফিতনা রুখতে হয় এবং কীভাবে হৃদয়ের ঈমানকে আচরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হয়।
আজকের এই অস্থির সময়ে যেখানে প্রযুক্তির অপব্যবহার আর নৈতিক অবক্ষয় আমাদের গ্রাস করছে, সূরা আল-হুজুরাতের শিক্ষাগুলোই হতে পারে আমাদের মুক্তির পথ। এর প্রয়োগে আমাদের পরিবারে ফিরে আসবে প্রশান্তি, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে সুদৃঢ় ঐক্য এবং আল্লাহর কাছে আমাদের ঈমান হবে গ্রহণযোগ্য ও পরিপূর্ণ। আল-কুরআন কেবল তিলাওয়াত করে সওয়াব হাসিলের কিতাব নয়; এটি এমন একটি বিধান, যা মানুষের জীবনে বাস্তবায়নের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত জেদ, অহংকার ও সামাজিক ব্যাধিগুলো পরিহার করে এই সূরার শিক্ষাকে ধারণ করাই হোক আজকের দিনের শপথ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন বুঝার এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আরও পড়ুন