দোয়া হলো ইবাদতের মূল এবং মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। প্রতিটি মুমিন ব্যক্তিই তার জীবনের সংকটময় মুহূর্তে বা বিশেষ প্রয়োজনে মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলে প্রার্থনা করেন। তবে অনেক সময় আমরা হতাশ হয়ে পড়ি যখন দেখি আমাদের দোয়া দ্রুত কবুল হচ্ছে না। ইসলামি শরিয়তে দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম, শর্ত এবং সময়ের কথা বলা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে দোয়া কবুলের আমল ও সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব কীভাবে দোয়া করলে আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয়।

একনিষ্ঠতা বা ইখলাস: দোয়া কবুলের প্রথম ও প্রধান শর্ত

দোয়া কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক শর্ত হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। এর অর্থ হলো হৃদয়ের সমস্ত আবেগ এবং বিশ্বাস দিয়ে কেবল আল্লাহকে ডাকা এবং অন্য কারো ওপর নির্ভরতা না রাখা।

ইখলাসের মূল বিষয়গুলো:

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন-

“অতএব, তোমরা আল্লাহকে খাঁটি বিশ্বাস সহকারে ডাক, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” (সূরা গাফির: ১৪)

হালাল উপার্জন

দোয়া কবুল হওয়ার জন্য সবচেয়ে মৌলিক পূর্বশর্ত হলো নিজের উপার্জনকে হালাল রাখা। ইসলামে হালাল রিজিকে যে বরকত নিহিত রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।

হারাম উপার্জিত অর্থের মাধ্যমে লালিত শরীর নিয়ে দোয়া করলে তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। তাই দোয়া কবুলের জন্য নিজের পেশা এবং উপার্জনকে সুদ, ঘুষ ও যাবতীয় হারাম থেকে পবিত্র রাখা অপরিহার্য। যখন একজন বান্দা হালাল খাদ্য গ্রহণ করে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তখন আল্লাহ সেই বান্দার আরজি ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।

‘’আবূ কুরায়ব মুহাম্মদ ইবনুল আলী (রহঃ)…আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা’আলা তার প্রেরিত রসূলদের যে হুকুম দিয়েছেন মুমিনদেরকেও সে হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভাল কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত।” (সূরা আল মু’মিনূন ২৩ঃ ৫১)

তিনি (আল্লাহ) আরো বলেছেন,

“তোমরা যারা ঈমান এনেছো শোনা আমি তোমাদের যে সব পবিত্র জিনিস রিযক হিসেবে দিয়েছি তা খাও”— (সূরা আল বাকারাহ ২ঃ ১৭২)। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, “হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু’আ তিনি কী করে কবুল করতে পারেন?” (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

হে রসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত। (সূরা আল মু’মিনূন ২৩ঃ ৫১)

অন্তরের একাগ্রতা এবং কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস

দোয়ার সময় অন্তরের একাগ্রতা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আমরা যান্ত্রিকভাবে কিছু শব্দ উচ্চারণ করি, কিন্তু আমাদের মন পড়ে থাকে পার্থিব কোনো চিন্তায়।

‘’আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা ক্ববূল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে আল্লাহ তা’আলার কাছে দু’আ কর। তোমরা জেনে রাখ যে, আল্লাহ তা’আলা নিশ্চয় অমনোযোগী ও অসাড় মনের দু’আ ক্ববূল করেন না।’’ (জামে’ আত-তিরমিজি : ৩৪৭৯)

দোয়া করার সময় এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আমি যার কাছে চাইছি তিনি মহাবিশ্বের মালিক এবং তিনি আমাকে দান করতে সক্ষম।

বিশ্বাস এবং একাগ্রতা বৃদ্ধির জন্য কিছু বিশেষ মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন-

এই মানসিক একাগ্রতা যখন তৈরি হয়, তখন বান্দার সাথে আল্লাহর একটি আধ্যাত্মিক সংযোগ তৈরি হয়, যা দোয়া কবুল হওয়ার পথ প্রশস্ত করে।

আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ শরীফের মাধ্যমে দোয়ার সূচনা

দোয়া শুরু করার একটি সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ পদ্ধতি রয়েছে। সরাসরি নিজের প্রয়োজনের কথা বলা শিষ্টাচার বহির্ভূত। রাসূলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন যে, দোয়ার শুরুতে প্রথমে মহান আল্লাহর প্রশংসা (হামদ) করতে হবে। যেমন- সুরা ফাতিহা পাঠ করা বা আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো স্মরণ করা। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা আবশ্যক।

‘’উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, দু’আ আকাশ যমিনের মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, তোমার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি যতক্ষণ তুমি দুরূদ পাঠ না কর ততক্ষণ তার কিছুই উপরে উঠে না।’’ (জামে’ আত-তিরমিজি : ৪৮৬)

দোয়া করার এই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিটি অনুসরণ করলে দোয়ার গাম্ভীর্য বৃদ্ধি পায়। শুরুতে এবং শেষে দরুদ পাঠ করা হলে আল্লাহ তাআলা মাঝখানের চাওয়াটুকুও কবুল করে নেন, কারণ তিনি দরুদ কবুল করেন এবং তার দয়া এতই বেশি যে তিনি আংশিক কবুল করে বাকিটুকু ফেলে দেন না।

আরেক হাদিস অনুযায়ী,

‘’ফাদালাহ ইবনু ‘উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ একদা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তিকে সলাতের মধ্যে দু‘আকালে আল্লাহর বড়ত্ব ও গুণাবলী বর্ণনা এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করতে শুনলেন না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ ব্যক্তি তাড়াহুড়া করেছে। অতঃপর তিনি ঐ ব্যক্তিকে অথবা অন্য কাউকে বললেনঃ তোমাদের কেউ সলাত আদায়কালে যেন সর্বপ্রথম তাঁর প্রভুর মহত্ব ও প্রশংসা বর্ণনা করে এবং পড়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর দরূদ পাঠ করে, অতঃপর ইচ্ছানুযায়ী দু‘আ করে।” (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮১)

আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহের উসিলা (আসমাউল হুসনা)

আমাদের জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধানের জন্য আল্লাহর বিশেষ বিশেষ নাম রয়েছে। দোয়া কবুল হওয়ার একটি অন্যতম কার্যকর উপায় হলো আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর উসিলা দিয়ে প্রার্থনা করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

“আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।” (সূরা আরাফ: ১৮০)। 

যেমন, যখন আপনি ক্ষমা চাইবেন তখন তাকে ‘ইয়া গাফফার’ বলে ডাকুন, যখন রিজিকের অভাব হবে তখন তাকে ‘ইয়া রাজ্জাক’ বলে সম্বোধন করুন। আল্লাহর এই নামগুলোর মধ্যে এক অলৌকিক শক্তি ও বরকত নিহিত রয়েছে। বান্দা যখন তার অভাবের সাথে মিল রেখে আল্লাহর নাম ধরে ডাকে, তখন মহান আল্লাহ তার রহমতের দ্বার উন্মোচন করে দেন। আল্লাহর নামের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন দোয়া দ্রুত কবুল হওয়ার অন্যতম কারণ।

দোয়া কবুলের বিশেষ সময়সমূহ কাজে লাগানো

আল্লাহ তাআলা দয়াবান এবং তিনি সবসময় বান্দার ডাক শোনেন, তবে কিছু বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যে সময়গুলোকে দোয়া কবুলের জন্য ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। হাদিস অনুযায়ী এই সময়গুলোতে দোয়া করলে তা বিফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। বিশেষ করে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে যখন মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাকে ডাকতে থাকেন সেটিই দোয়া করার শ্রেষ্ঠ সময়।

এ ছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় ও অবস্থা হলো:

এই বিশেষ সময়গুলোতে বান্দা যখন কাতর হয়ে আল্লাহর কাছে চায়, তখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। তাই এই মুহূর্তগুলো অবহেলায় পার না করে অধিক পরিমাণে রোনাজারি করা উচিত।

ধৈর্য ধারণ এবং অস্থিরতা বর্জন করা

দোয়া করার পর ফল পেতে বিলম্ব হলে অনেকেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং দোয়া করা ছেড়ে দেন। এটি দোয়া কবুল না হওয়ার একটি বড় কারণ।

‘’আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দু’আ কবূল হয়ে থাকে। যদি সে তাড়াহুড়া না করে আর বলে যে, আমি দু’আ করলাম। কিন্তু আমার দু’আ তো কবূল হলো না।’’ (সহিহ বুখারী : ৬৩৪০)

দোয়া কবুল হওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে: হয় আল্লাহ দুনিয়াতে তা সরাসরি পূরণ করেন, অথবা এর বিনিময়ে কোনো আপদ-বিপদ দূর করে দেন, অথবা এটি পরকালের জন্য সঞ্চয় হিসেবে রেখে দেন। সুতরাং কোনো দোয়াই আসলে বিফলে যায় না। ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর সুধারণা পোষণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এই ধৈর্যই অনেক সময় বড় বড় নেয়ামত প্রাপ্তির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

গুনাহ বর্জন ও নেক আমলের উসিলা পেশ করা

পাপাচার এবং অবাধ্যতা মানুষের দোয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং মানুষের হক নষ্ট করা দোয়া কবুলের পথে বড় বাধা। তাই দোয়া করার আগে নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করা উচিত। অন্যদিকে, নিজের কোনো গোপন নেক আমলের উসিলা দিয়ে দোয়া করা অত্যন্ত কার্যকর।

হাদিসে বর্ণিত সেই তিন ব্যক্তির কাহিনী আমাদের জন্য বড় শিক্ষা, যারা পাহাড়ের গুহায় আটকা পড়ে নিজেদের সৎ কাজের উসিলা দিয়ে দোয়া করেছিলেন এবং অলৌকিকভাবে পাথর সরে গিয়েছিল (source)।আপনি যদি কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো ভালো কাজ করে থাকেন, তবে সেই কাজের কথা উল্লেখ করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারেন। এই পদ্ধতিতে দোয়া করলে আল্লাহর রহমত দ্রুত ধাবিত হয়।

বিনয়, রোনাজারি এবং তিনবার করে দোয়া করা

আল্লাহর কাছে দোয়ার অন্যতম আদব হলো কান্নাকাটি করা এবং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বারবার চাওয়া। আল্লাহ তাআলা সেই বান্দাকে পছন্দ করেন যে তার কাছে কাকুতি-মিনতি করে এবং বারবার একই বিষয় প্রার্থনা করে। নিজেকে নিঃস্ব এবং অসহায় হিসেবে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করলে আল্লাহর দয়া উথলে ওঠে। আপনি যদি কাঁদতে নাও পারেন, তবে অন্তত কান্নার ভান বা কাঁদো কাঁদো স্বরে প্রার্থনা করুন। এই বিনয়ী ভাব আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। মনে রাখবেন, আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না, কিন্তু অনুতপ্ত ও বিনয়ী বান্দার জন্য তার রহমতের দরজা সবসময় খোলা থাকে।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা

পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে নিয়মিত ইবাদত করলেও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলেন, যা দোয়া কবুলের পথে একটি বড় অন্তরায়। হাদিস অনুযায়ী, যারা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, তাদের আমল আল্লাহর দরবারে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হয়।

“আবু তাহির (রহঃ)…আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) এর সানাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, বান্দার দু’আ সর্বদা গৃহীত হয় যদি না সে অন্যায় কাজ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য দুআ করে এবং (দুআয়) তাড়াহুড়া না করে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! (দু’আয়) তাড়াহুড়া করা কি? তিনি বললেন, সে বলতে থাকে, আমি দুআ তো করেছি, আমি দুআ তো করেছি; কিন্তু আমি দেখতে পেলাম না যে, তিনি আমার দু’আ কবুল করেছেন। তখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর দু’আ করা পরিত্যাগ করে।” (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)।

তাই দোয়া করার পাশাপাশি নিজের আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে যাদের সাথে মনোমালিন্য আছে, তাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা জরুরি। এটি কেবল দোয়া কবুলই করে না, বরং মানুষের হায়াত ও রিজিকেও বরকত দান করে।

অন্য মুসলমান ভাইয়ের জন্য অগোচরে দোয়া করা

আমরা যখন নিজেদের জন্য দোয়া করি, তখন অনেক সময় তাতে স্বার্থপরতা কাজ করে। কিন্তু দোয়া কবুলের একটি চমৎকার ও দ্রুততম উপায় হলো অন্য কোনো মুসলিম ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করা। যখন আপনি অন্যের কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তখন ফেরেশতারা আপনার জন্য একই দোয়া করতে থাকেন।

“ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ)…উম্মু দারদা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নেতা (স্বামী) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেছেন, যে লোক তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দু’আ করে, তার জন্য একজন নিয়োজিত ফেরেশতা ’আমীন’ বলতে থাকে আর বলে, তোমার জন্যও অনুরূপ।” (সহিহ মুসলিম: ২৭৩২)।

আল্লাহর কাছে ফেরেশতাদের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সুতরাং, নিজের দোয়া কবুল করাতে চাইলে অন্যের জন্য মন খুলে দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ (আমর বিল মারুফ)

একটি সমাজের সামগ্রিক দোয়া কবুল হওয়ার জন্য সেই সমাজে ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ চালু থাকা আবশ্যক। যখন কোনো জাতি অন্যায় দেখেও চুপ থাকে এবং পাপের প্রতিবাদ করা ছেড়ে দেয়, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া কবুল করা বন্ধ করে দেন। এটি ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

“হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিতঃনবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ্ তা’আলা শীঘ্রঈ তোমাদের উপর তাঁর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তাঁর নিকট দু’আ করলেও তিনি তোমাদের সেই দু’আ গ্রহন করবেন না।” (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৯)

ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়ের পথে চলা এবং সামাজিকভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম, যা দোয়া কবুলের পরিবেশ তৈরি করে।

পাপ স্বীকার ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন

দোয়া কবুলের অন্যতম গোপন রহস্য হলো নিজের পাপের জন্য লজ্জিত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা বা ইস্তিগফার পাঠ করা। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ কেবল গুনাহ মাফ করেন না, বরং আসমান থেকে বৃষ্টির রহমত, সম্পদ ও সন্তান দান করে বান্দাকে ধন্য করেন।

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:

“আমি বলেছি- ‘তোমরা তোমাদের রব্বের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন সম্পদ ও সন্তানাদি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।” (সূরা নূহ: ১০-১২)।

দোয়ার আগে অন্তত কয়েকবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করলে অন্তরের কলুষতা দূর হয়। নবী করিম (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও দিনে ৭০ বার এর বেশী ইস্তিগফার করতেন। নিজের অক্ষমতা ও পাপ স্বীকার করলে আল্লাহর দয়া দ্রুত আকর্ষিত হয়।

সংকটের সময় নয়, সুসময়েও আল্লাহর স্মরণ

আমরা সাধারণত বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকি। কিন্তু দোয়ার প্রকৃত শক্তি হলো সুসময়ে বা সুখের দিনেও আল্লাহকে স্মরণে রাখা। আপনি যদি আপনার আনন্দ ও সচ্ছলতার দিনগুলোতে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন এবং দোয়া করেন, তবে আপনার কঠিন সময়ে আল্লাহ আপনার ডাক দ্রুত শুনবেন।

“আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক বিপদাপদ ও সংকটের সময় আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহ লাভ করতে চায় সে যেন সুখ-স্বাচ্ছন্দের সময় বেশি পরিমাণে দুআ করে।” (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৮২)

উপসংহার

দোয়া কবুল হওয়া কেবল একটি বস্তুগত প্রাপ্তি নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে। উপরে আলোচিত হালাল উপার্জন, একাগ্রতা, দরুদ শরীফ, আসমাউল হুসনার উসিলা, বিশেষ সময়ের সদ্ব্যবহার, ধৈর্য, আত্মীয়তার বন্ধন এবং ইস্তিগফারের মতো বিষয়গুলো দোয়া কবুলের প্রধান সহায়ক।

অনেক সময় আমরা যা চাই, আল্লাহ তা দেন না কারণ তিনি জানেন সেটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি যা দেন বা যা লিখে রাখেন, তাই আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ। সুতরাং হতাশ না হয়ে প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্নাহসম্মত নিয়মগুলো অনুসরণ করে বিশুদ্ধ নিয়তে নিরন্তর আল্লাহর কাছে চাইতে থাকুন। আল্লাহ তাআলা তাঁর মুখাপেক্ষী বান্দাকে কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। আল্লাহ দোয়া শোনেন ও কবুল করেন – এটা আল্লাহর ওয়াদা। আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *