আজকের পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে যুবকদের ভূমিকা কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং অপরিহার্য। সেই অপরিহার্যতা এবং কর্মতৎপরতার বাস্তবমুখী দিকগুলো নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

যৌবন: রবের শ্রেষ্ঠ আমানত ও পরকালীন নাজাতের সোপান

যৌবন কেবল বয়সের একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত এবং একটি পবিত্র আমানত। হাশরের সেই ভয়াবহ দিনে, যখন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, তখন যে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোনো আদম সন্তান এক কদম নড়তে পারবে না। তার অন্যতম হলো:

আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “কোন বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামাত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবেঃ কিভাবে তার জীববনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে ; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কি কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে।” (জামে’ আত-তিরমিজি : ২৪১৭)

যৌবনকাল কেবল উদাসীনতায় কাটানোর সময় নয়; বরং এটি আল্লাহর দরবারে হিসাব দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। একজন মুমিন যুবকের শক্তি, মেধা আর প্রাণোচ্ছলতা যখন মানবতার কল্যাণ ও দ্বীনের তরে নিবেদিত হয়, তখন তার প্রতিটি কাজই পরিণত হয় শ্রেষ্ঠ ইবাদতে।

নৈতিকতা ও তাকওয়াভিত্তিক জীবন গঠন

একটি আদর্শ সমাজের মূল ভিত্তি হলো নাগরিকদের চারিত্রিক পবিত্রতা। যুবকরা যদি পাপাচার, অশ্লীলতা এবং অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকে, তবে সমাজ এমনিতেই শান্তিময় হয়ে ওঠে। ইসলাম যুবকদের ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।” (সূরা কাহাফ: ১৩)

আসহাবে কাহাফের এই যুবকরা প্রতিকূল পরিবেশেও সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল ছিলেন। বর্তমান যুগের যুবকদেরও উচিত সকল প্রলোভন উপেক্ষা করে নিজেদের চরিত্রকে নিষ্কলুষ রাখা। যখন যুবকরা মাদক, পর্নোগ্রাফি এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধ থেকে নিজেদের রক্ষা করবে, তখনই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত হবে।

জ্ঞানার্জন ও দাওয়াহ: আলোকিত সমাজ গড়ার মূলমন্ত্র

একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা বা সার্টিফিকেটের লড়াই নয়; বরং তা হতে হবে নৈতিকতা, সততা এবং দ্বীনি মূল্যবোধের এক অপূর্ব সমন্বয়।

জ্ঞানার্জন: অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই

সুশিক্ষা আজকের যুবকদের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব। তাদের একদিকে যেমন আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর জগৎকে জয় করতে হবে, তেমনি ইসলামের মৌলিক ও গভীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হবে।

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ”জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যক্তির সমতুল্য।” (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪)

যুবকরা যখন কুরআন-সুন্নাহর আলোয় আলোকিত হবে, তখনই তারা সমাজ থেকে কুসংস্কারের অন্ধকার, শিরকের বিভ্রান্তি এবং বিদআতের অভিশাপ দূর করতে পারবে। জ্ঞানহীন আবেগ অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়, তাই সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমেই যুবকদের হয়ে উঠতে হবে সমাজের দিশারি।

দাওয়াহ: আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ

সমাজের প্রতিটি স্তরে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেওয়া বা ‘দাওয়াহ’ কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, এটি যুবকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবে দাওয়াহ মানে কেবল মুখে বলা নয়, বরং নিজের জীবন দিয়ে ইসলামকে প্রদর্শন করা। সুন্দর আচরণ: আপনার হাসি এবং মার্জিত কথা যেন অন্যের মনে প্রশান্তি দেয়।

সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ

ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো সাম্য ও সুমহান ন্যায়বিচার। একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক সমাজ গঠনে যুবকরাই হলো অগ্রবাহিনী। সমাজের মজলুম ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে দাঁড়িয়ে বর্তমান সময়ের যাবতীয় বৈষম্য নিরসনে তরুণ প্রজন্মকে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। তারুণ্যের শক্তি যখন ইসলামের মানবিক মূল্যবোধের সাথে মিলিত হয়, তখন একটি সুন্দর ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠিত হয়। 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যুবকদের দায়িত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।” (সূরা আল-ইমরান: ১১০)

সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় যুবকদের এগিয়ে আসা কেবল সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি ইমানি দাবি। একজন সচেতন তরুণ হিসেবে তার উচিত:

সমাজসেবা ও পরোপকার

দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন: কেবল সাময়িক সাহায্য নয়, বরং দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করতে যুবকরা উদ্যোগ নিতে পারে। পাড়ায় পাড়ায় ‘যাকাত ফান্ড’ বা ‘সাদাকা বক্স’ তৈরি করে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কর্মহীনদের রিকশা, সেলাই মেশিন বা ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন জোগান দেওয়া সম্ভব। এতে সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি দূর হবে এবং বেকারত্ব কমবে।

রক্তদান ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা: “রক্ত দিন, জীবন বাঁচান” এই স্লোগানকে সামনে রেখে যুবকরা রক্তদাতাদের ডাটাবেজ তৈরি করতে পারে। এছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে চিকিৎসা সেবা পৌঁছায় না, সেখানে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের সহায়তায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা এবং জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স সাপোর্ট বা ওষুধের ব্যবস্থা করা যুবকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

পরিবেশ রক্ষা ও ‘সবুজ বিপ্লব’: রাসূলুল্লাহ (সা.) বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া (অবিরাম সওয়াব) হিসেবে অভিহিত করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যুবকরা ফলদ ও বনজ বৃক্ষরোপণ অভিযান চালাতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জন ও ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম-পরিচ্ছন্ন শহর’ কর্মসূচির মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।

দুর্যোগ মোকাবিলা ও তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ: বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অগ্নিকাণ্ডের মতো যেকোনো প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে যুবকরাই প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামত এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তায় যুবকদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

প্রযুক্তির ফিতনা: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও যুবসমাজের সতর্কতা

আমরা এখন বাস করছি তথ্যপ্রযুক্তির এক অভাবনীয় যুগে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও বর্তমান প্রজন্মের জন্য এটি এক বিশাল ‘ফিতনা’ বা পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন আদর্শ যুবক হিসেবে এই ডিজিটাল সমুদ্রে নিজেকে টিকিয়ে রাখা এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় জিহাদ।

একটি সুন্দর সমাজ ও উন্নত চরিত্র গঠনে প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করা অপরিহার্য:

প্রযুক্তিকে অভিশাপ না বানিয়ে আমরা একে কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

প্রযুক্তি একটি মাধ্যম মাত্র; এর ব্যবহারকারী হিসেবে আপনি এটি দিয়ে জান্নাতের পথ সুগম করবেন নাকি বিপথে যাবেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনার। আসুন, আমরা প্রযুক্তিকে আসক্তি নয়, বরং সদকায়ে জারিয়া এবং জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি।

হালাল উপার্জন ও স্বাবলম্বিতা: সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের চাবিকাঠি

একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার যুবসমাজ অলসতা কাটিয়ে কর্মঠ হয়ে ওঠে। ইসলামে পরনির্ভরশীলতা বা ভিক্ষাবৃত্তিকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়াকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

হালাল উপার্জনের গুরুত্ব বোঝাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

মিকদাম (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, “নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।” (সহিহ বুখারী : ২০৭২)

প্রতিবেশী ও অভাবী মানুষের অধিকার: সামাজিক সংহতির মূলমন্ত্র

একটি আদর্শ ও বাসযোগ্য সমাজ তখনই গড়ে ওঠে, যখন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় থাকে। ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করাকে কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

মানবতার মুক্তির দূত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন:

“আব্দুল্লাহ্ ইবন মুসাবির বলেন, আমি হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রাযিঃ) ইবন যুবায়রকে অবগত করিয়া বলিতে শুনিয়াছি যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি নবী করীম (ﷺ)-কে বলিতে শুনিয়াছি ঃ সে ব্যক্তি মু’মিন নহে-যে নিজে পেট পুরিয়া ভােজন করে, অথচ তাহার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ: হাদীস নং: ১১২)

সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে যুবকদের উচিত নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ঊর্ধ্বে উঠে আর্তমানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করা। এক্ষেত্রে যুবসমাজ যে পদক্ষেপগুলো নিতে পারে:

সামাজিক কুসংস্কার ও জাহিলিয়াত নির্মূল

আমাদের সমাজে আজও অনেক কুসংস্কার ও অনৈসলামিক প্রথা শিকড় গেড়ে আছে, যা প্রগতির পথে বাধা। ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে তরুণদের দায়িত্ব হলো জ্ঞান ও যুক্তির আলোকে এই জাহিলিয়াত বা অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা। যৌতুক প্রথা, অহেতুক লোকদেখানো অনুষ্ঠান, এবং ভাগ্যগণনার মতো শিরক ও বিদআতি কর্মকাণ্ড থেকে সমাজকে পবিত্র করতে যুবকদের সোচ্চার হতে হবে। যখন তরুণরা কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে, তখন সমাজ থেকে অমূলক ভয় ও ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়ে যাবে।

সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রসার: যুবসমাজের নৈতিক সুরক্ষা

বর্তমান যুগে বিনোদনের নামে সমাজে যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তা আমাদের যুবসমাজের নৈতিক ভিত্তি ও সুকুমার বৃত্তিগুলোকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ডিজে পার্টির নামে উগ্রতা, অশ্লীল নাচ-গান এবং জুয়ার মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাসগুলো তরুণদের সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে তাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। একটি আদর্শ ও সুন্দর সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত হলো অপসংস্কৃতির এই বিষাক্ত প্রভাব থেকে যুবসমাজকে মুক্ত রাখা। আর এই পরিবর্তনের প্রধান কারিগর হতে হবে তরুণদেরই, যারা অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে সুস্থ ও রুচিশীল বিনোদনের একটি নতুন ধারা তৈরি করবে।

যুবকরা যখন মাদক বা অপরাধের অন্ধকার জগত ছেড়ে খেলাধুলার সবুজ মাঠে কিংবা পাঠাগারের জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত থাকবে, তখন সমাজ থেকে এমনিতেই অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে। তারা পাড়া-মহল্লায় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামী নাশিদ, মেধা যাচাইমূলক কুইজ প্রতিযোগিতা এবং সৃজনশীল সাহিত্য চর্চার উদ্যোগ নিতে পারে। এই ধরনের ইতিবাচক কার্যক্রম কেবল চিত্তবিনোদনের উৎসই নয়, বরং যুবকদের মধ্যে চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। প্রকৃতপক্ষে, সুস্থ বিনোদনের ব্যাপক প্রসারই পারে অপসংস্কৃতির জোয়ার রুখে দিয়ে একটি শান্তিময় ও সমৃদ্ধ সমাজ উপহার দিতে।

মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে ভূমিকা

বর্তমান সমাজে যুবসমাজের সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো মাদক এবং এলাকাভিত্তিক অপরাধী চক্র বা ‘কিশোর গ্যাং’। একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে যুবকদের প্রধান দায়িত্ব হলো এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং ছোট ভাইদের নিরাপদ রাখা।

কেন আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি?

প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

১. সুস্থ বিনোদন নিশ্চিত করা: এলাকাভিত্তিক খেলাধুলা ও গঠনমূলক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। কিশোরদের মাঠমুখী রাখা গেলে তারা অপরাধের পথে পা বাড়ানোর সময় পাবে না। ২. পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন: ছোট ভাইদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে তারা যেকোনো সমস্যায় ভুল পথে না গিয়ে বড় ভাইদের পরামর্শ নিতে পারে। ৩. ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ: রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিটি অন্যায়কে শক্তি দিয়ে অথবা কথার মাধ্যমে বাধা দিতে। যুবকদের এই ঈমানি ও নৈতিক শক্তি নিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ অভিযান: সদকা-এ-জারিয়ার অনন্য সুযোগ

একটি আদর্শ সমাজ কেবল মানবিক মূল্যবোধেই নয়, বরং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও আদর্শ হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়াবহতা আমরা লক্ষ্য করছি, তা থেকে সমাজ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করা যুবসমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি সামাজিক কাজ নয়, বরং এটিকে একটি নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত বা ‘সদকা-এ-জারিয়া’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে কোন মুসলমান ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোন ফসল ফলায় আর তা হতে পাখী কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায় তবে তা তার পক্ষ হতে সদাকা বলে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারী : ২৩২০)

আদর্শ সমাজ গঠনে যুবকদের এই বৃক্ষরোপণ অভিযান যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারে:

একটি দূষণমুক্ত, সবুজ এবং বাসযোগ্য পৃথিবী বিনির্মাণে যুবকদের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগই হতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ উপহার।

পারিবারিক সংহতি: আদর্শ সমাজ গঠনের মূলমন্ত্র

বর্তমান সময়ে আমাদের সামাজিক কাঠামোর অন্যতম বড় সংকট হলো পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা। বিশেষ করে প্রবীণ সদস্যদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবহেলা আমাদের নৈতিক অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান কারিগর হতে পারে দেশের যুবসমাজ। একজন যুবকের প্রকৃত চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রকাশ পায় তার পরিবারের সদস্যদের সাথে আচরণে। মা-বাবার সেবা এবং আত্মীয়তার বন্ধন (সিলাহুর রাহিম) রক্ষা করার মাধ্যমে একজন যুবক কেবল নিজের দায়িত্বই পালন করেন না, বরং সমাজে একটি শক্তিশালী পারিবারিক কাঠামোর মডেল স্থাপন করেন।

যিনি নিজের পরিবারে আদর্শ হতে ব্যর্থ, তার পক্ষে বৃহত্তর সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত- “আগে ঘর, তারপর সমাজ।”

নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন

ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব আজকের যুবকদের ওপর। তাই তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলা জরুরি। আমানতদারি, সাহসিকতা এবং দূরদর্শিতা এই তিনটি গুণ একজন মুসলিম যুবকের চরিত্রে থাকা আবশ্যক। ক্ষমতার লোভ নয়, বরং সেবার মানসিকতা নিয়ে তাদের নেতৃত্ব শিখতে হবে। যোগ্য নেতৃত্বই পারে একটি পথভ্রষ্ট সমাজকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করতে।

উপসংহার

আল্লাহ তায়ালা আমাদের যুবসমাজকে কবুল করুন এবং তাদের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *