
তাওবা হলো বান্দা ও আল্লাহর মাঝে সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কের প্রকাশ। কিন্তু এই তাওবা যদি আন্তরিক না হয়, যদি তা লোক দেখানো হয়, তাহলে তা মানুষের জন্য রহমত নয় বরং ভয়াবহ শাস্তির কারণও হতে পারে। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা আছে, যা আমাদের সতর্ক করে দেয়। তেমনই এক হৃদয়বিদারক ও চিন্তাজাগানিয়া ঘটনা বর্ণনা করেছেন প্রখ্যাত তাবেয়ী ও ওয়ায়েজ মনসুর ইবনে আম্মার (রহ.)। এই ঘটনা আমাদের শেখায় মিথ্যা তাওবা, রিয়া ও গোপন গুনাহ কিভাবে মানুষের পরিণতি ধ্বংস করে দিতে পারে।
মূল ঘটনা
মনসুর ইবনে আম্মার বর্ননা করেন,
“আমার একজন বন্ধু ছিল। সে জীবনে অনেক গুনাহ করেছিল।
নিজের উপর জুলুম করেছিল, নিজের উপর অবিচার করেছিল।
অতঃপর সে আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওবা করে।
তাওবা করার পর থেকে আমি তাকে দেখতাম সে অনেক এবাদত করত, অনেক নামাজ পড়ত, অনেক রোজা রাখত, অনেক তাহাজ্জুদ পড়ত।
হঠাৎ করে একদিন তাকে খুজে পাচ্ছিলাম না।
আমি তার খোঁজে তার বাড়িতে গেলাম। আমি দরজায় গিয়ে আওয়াজ দিলাম। ভিতর থেকে তার মেয়ে বের হয়ে আসল, আমাকে জিজ্ঞাসা করল,
“কাকে খুজচ্ছেন?”
তখন আমি বললাম,
“তোমার আব্বুকে যেয়ে বল অমুক এসেছে।”
অতঃপর আমাকে ভিতরে আসতে বলা হলো।
আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম।
আমি দেখলাম সে বাড়ির মাঝখানে শুয়ে আছে।
তার চেহারা বিকৃত হয়ে গিয়েছে।
তার চোখগুলো বড়বড় হয়ে গেছে।
তখন আমি তার এই অবস্থা দেখে বললাম,
“হে আমার ভাই আমার ভয় হচ্ছে।
তুমি বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে থাক।”
একথা শুনে সে অনেক কষ্ট করে আমার দিকে তাকাল।
অতঃপর বেহুশ হয়ে গেল।
যখন তার হুশ ফিরে আসল, আমি তাকে দ্বিতীয়বার আবারও বললাম,
”হে ভাই, বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে থাক।”
সে আবারও বেহুশ হয়ে গেল।
যখন তার হুশ ফিরে আসল আমি তাকে তৃতীয়বার আবারও বললাম,
“হে ভাই, বেশি বেশি করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে থাক।”
সে চোখ খুলল, আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল,
“হে ভাই মনসুর! আমার মাঝে আর এই কালেমার মাঝে প্রাচীর তৈরী করে দেয়া হয়েছে।
আমি ইচ্ছা করলেও এই কালেমা পাঠ করতে পারছিনা।”
তখন আমি বলে উঠলাম,
“লা হাওলা ওয়া লা কুয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ।”
এরপর আমি তাকে বললাম,
”তুমি যে এত এবাদত করতে, এত আমল করতে, এত তাহাজ্জুদ পড়তে এগুলোর কি হল?”
তখন সে বলল,
“তুমি যে আমাকে এবাদত করতে দেখতে, আমি কোন কিছুই আল্লাহর জন্য করতাম না।
আমি আমার সকল এবাদত, আমি আমার সকল আমল, এগুলো মানুষদের দেখানোর জন্য করতাম।
আমার তাওবা ছিল মিথ্যা তাওবা।
আমি মানুষকে দেখানোর জন্য তাওবা করেছিলাম।
মূলত বাহ্যিক ভাবে মানুষদের দেখানোর জন্য এবাদত করতাম।
কিন্তু আমি যখন একাকি থাকতাম, আমি আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মদ পান করতাম, আমি নির্জন মূহুর্তে বিভিন্ন ধরনের গুনায় লিপ্ত হতাম!
আমার মনে আছে, একবার আমি খুব গুরতর অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম।
আমার ধারনা হচ্ছিল, আমি আর বাঁচব না।
তখন আমি আমার পরিবারের লোকজনকে বললাম, আমাকে ধরে বাড়ির মাঝখানে নিয়ে আস এবং আমার নিকট কোরআন শরীফ নিয়ে আস।
অতঃপর তারা আমাকে ধরে বাড়ির মাঝখানে নিয়ে গেল এবং আমার নিকট কোরআন শরীফ নিয়ে আসল।
আমি কোরআনকে খুলে পড়তে লাগলাম এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলাম, হে পরম দয়ালু আল্লাহ! হে পরম দয়ালু আল্লাহ!
এই কোরআনের মাধ্যমে তুমি আমাকে সুস্থতা দান কর।
আমি তোমার সাথে ওয়াদা করছি, আমি তোমার সাথে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হচ্ছি, আমি আর কোনদিন গুনাহ করব না, আমি আর কোনদিন গুনাহের দিকে পা বাড়াবো না।
আল্লাহ তায়ালা আমাকে সুস্থতা দান করলেন।
যখন আমি সুস্থ হলাম, তখন আমি আগের মতই আবারও গুনায় লিপ্ত হলাম!
প্রতিনিয়ত গুনাহ করতে থাকলাম।
এভাবে গুনাহ করতে করতে, নাফরমানি করতে করতে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল।
অতঃপর আমি দ্বিতীয়বার আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লাম।
আমি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলাম।
আমার আবারও মনে হচ্ছিল যে আমি আর বাঁচব না।
আমি আর পৃথিবীতে থাকতে পারব না।
তখন আমি আমার পরিবারকে আবারও বললাম, তোমরা আমাকে উঠানে নিয়ে চল, আমার কাছে কোরআন নিয়ে আস।
আমি প্রথমবারের মত দ্বিতীয়বার আবারও প্রার্থনা করলাম।
আমি আবারও আকাশের দিকে দুহাত তুলে বললাম, হে আমার প্রতিপালক, হে আমার প্রতিপালক, হে আমার রব! এই কোরআনের মাধ্যমে তুমি আমাকে সুস্থতা দান কর।
আল্লাহ তা’য়ালা আমার ডাকে আবারও সাড়া দিলেন।
আমাকে রোগ থেকে মুক্তি দিলেন।
আমি আবারও অঙ্গীকার করলাম যে, আমি আর কখনোই গুনাহ করব না, আমি আর কখনোই গুনার দিকে পা বাড়াব না।
কিন্তু দ্বিতীয়বারও আমি আমার অঙ্গীকারের কথা আবারও ভুলে গেলাম।
আমি আবারও গুনায় নিমজ্জিত হলাম।
আমি আবারও গুনার সমুদ্রে হাবুডুব খেতে লাগলাম।
এভাবে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল।
এরপর আমি তৃতীয়বার আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লাম, যা তুমি এখন দেখতে পাচ্ছ।
অতঃপর আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, আমাকে উঠানে নিয়ে চল, আমার কাছে কোরআন আন।
তারা আমাকে উঠানে নিয়ে গেল, আমার কাছে কোরআন নিয়ে আসল।
অতঃপর এবার যখন আমি তেলয়াত করার জন্য কোরআনকে খুললাম, আমি দেখতে পেলাম, কোরআনের সমস্ত পৃষ্ঠাগুলো সাদা হয়ে গেছে!
পুরো কোরআনের মাঝে একটি অক্ষরও আমার চোখে পড়ল না!
আমি বুঝতে পারলাম, আসমান জমিনের অধিপতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমার উপর রাগান্বিত হয়েছেন।
আসমান জমিনের অধিপতি আল্লাহ সুবানাহু ওয়া তায়ালা আমার উপর ক্রোধান্বিত হয়েছেন।
কারন, আমি বহুবার তার সাথে ওয়াদা করেছি, বহুবার ওয়াদা ভঙ্গ করেছি।
আমি বহুবার তার কাছে তাওবা করেছি, বহুবার তাওবা ভঙ্গ করেছি।
তিনি আমাকে অনেকবার সুযোগ দিয়েছেন কিন্তু আমি বারবার এই সুযোগের অপব্যবহার করেছি।
আমি বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ তায়ালা আমার উপর রাগান্বিত হয়েছেন।
তাই আমি আসমানের দিকে হাত তুলে বললাম, হে আল্লাহ! আমাকে এই বিপদ থেকে মুক্তি দাও, হে আল্লাহ! আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা কর, আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্বার কর।
আমি যখন এই কথাগুলো শেষ করলাম, আমি শুনতে পেলাম যেন আসমান থেকে আমাকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে,
“তুমি যখন বিপদে পর তখনই আমার কাছে আসো, আর যখন বিপদ শেষ হয়ে যায় তখন আবারও গুনায় লিপ্ত হও।
তোমাকে আমি কতবার বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি, তোমাকে কতবার বিপদ থেকে রক্ষা করেছি, কিন্তু তুমি একবারও নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করোনি।”
মনসুর ইবনে আম্মার বলেন,
“একথা শুনে ক্রন্দন করতে করতে তার কাছ থেকে উঠে গেলাম।’’
আমি যখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার কাছাকাছি পৌছলাম তখন পিছন থেকে সংবাদ আসল সে মারা গেছে।
সে মৃত্যুবরন করেছে।
সে তাওবা না করেই মৃত্যুবরন করছে।
তার মাঝে ও তাওবার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দিয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের ডাক দিয়ে বলছেন-
“হে মুমিনগণ! আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর। অসম্ভব নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপসমূহ তোমাদের থেকে মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে এমন উদ্যানে প্রবেশ করাবেন, যার নিচে নহর বহমান থাকবে, সেই দিন, যে দিন আল্লাহ নবীকে এবং তাঁর সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের আলো তাদের সামনে ও তাদের ডান পাশে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এ আলোকে পরিপূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান।”(সূরা তাহরীম: ৮)
আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি অশেষ দয়ালু।
তিনি আমাদেরকে বারবার তাওবা করার সুযোগ করে দিয়েছেন, বারবার তাঁর পথে আহ্বান করছেন, যাতে আমরা ভুল থেকে ফিরে আসতে পারি, পাপ থেকে মুক্ত হতে পারি।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আমরা এই মহামূল্যবান সুযোগের অবমূল্যায়ন করছি,
বরং অনেক সময় অপব্যবহার করছি।
আমরা ভাবি-
“আরও সময় আছে”,
“পরে একদিন ঠিক হয়ে যাব”,
“শেষ বয়সে তাওবা করব”।
কিন্তু আমরা কি জানি-
মৃত্যু কখন এসে উপস্থিত হবে?
এক সময় এমন মুহূর্ত আসবে,
যখন আমাদের সামনে মৃত্যুর পর্দা নেমে আসবে।
তখন আমরা তাওবা করতে চাইব,
কিন্তু সে তাওবা আর কবুল হবে না।
এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন-
“আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকেঃ আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।” (সূরা নিসা: ১৮)
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
আর দেরি নয়,
আর অবহেলা নয়।
আসুন,
এখনই তাওবা করি,
সুযোগ থাকতে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি,
সুস্থ অবস্থায়, জীবিত অবস্থায় রবের সন্তুষ্টি অর্জন করি,
আর অন্তর থেকে দৃঢ় ঈমানে বিশ্বাস স্থাপন করে আমল দ্বারা সেই ঈমানকে জীবন্ত করে তুলি।
আর অন্তর থেকে দৃঢ় ঈমানে বিশ্বাস স্থাপন করে আমল দ্বারা সেই ঈমানকে জীবন্ত করে তুলি।
কারণ আজ তাওবার দরজা খোলা, কিন্তু আগামীকাল যে থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি তাওবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আরো পড়ুন