
আধুনিক সময়ে নারী অধিকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা সম্পর্কে নানামুখী মতামত উপস্থাপন করা হলেও দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের অবস্থানকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন ইসলাম নারীকে সীমাবদ্ধ করেছে; অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামই প্রথম নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসলাম একটি মানবিক জীবনব্যবস্থা, যেখানে নারীকে অবহেলার বস্তু নয়, বরং সম্মানিত মানুষ হিসেবে দেখা হয়। এই মানবিক জীবনব্যবস্থার আওতায় ইসলাম নারীকে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার প্রদান করেছে, সম্পত্তির মালিকানা নিশ্চিত করেছে এবং সামাজিক মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাহেলিয়াতের যুগে যখন নারী ছিল নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত, তখন ইসলাম তাকে সেই অন্ধকার থেকে মুক্ত করে একজন পূর্ণাঙ্গ, সচেতন ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করে।
ইসলাম-পূর্ব যুগে নারীর অবস্থান
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী আরব সমাজে নারীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত করুণ ও অবমাননাকর। সামাজিক কাঠামোর কোথাও নারীর স্বতন্ত্র মর্যাদা স্বীকৃত ছিল না, বরং তাকে পরিবার ও সমাজের জন্য এক প্রকার বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াকে লজ্জা ও অপমানের বিষয় মনে করা হতো, যার পরিণতিতে বহু স্থানে নিষ্ঠুরভাবে নবজাত কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো অমানবিক প্রথা চালু ছিল।
সে সময় নারীর কোনো সামাজিক বা আইনগত অধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার, মতামত প্রকাশ কিংবা নিজের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকে তাকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রাখা হতো। নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং ভোগ্যবস্তু বা সম্পদের অংশ হিসেবেই দেখা হতো। এই বাস্তবতা তখনকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নির্মম চিত্র তুলে ধরে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
“তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় আর সে অন্তর্জ্বালায় পুড়তে থাকে।” (সূরা আন-নাহল: ৫৮)
কুরআনের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের মর্যাদা
ইসলামের মৌলিক দর্শনে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো প্রকার শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক বিভাজন নেই। শারীরিক গঠন, দায়িত্ব কিংবা সামাজিক ভূমিকার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও মানবিক মর্যাদা ও আত্মিক মূল্যায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে মূল্যায়ন করে। কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার লিঙ্গের মাধ্যমে নয়; বরং তার ঈমান, চরিত্র ও তাকওয়ার ভিত্তিতে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
“হে মানুষ! তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
নারী একজন পূর্ণ মানবসত্তা
ইসলাম নারীকে কখনোই পুরুষের অধীন কোনো গৌণ সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেনি। বরং তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যার রয়েছে চিন্তা করার ক্ষমতা, অনুভবের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী কেবল পরিবার বা সমাজের একটি অংশ নয়, বরং সে নিজেই একটি স্বতন্ত্র সত্তা, যার সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ তাআলা নিজেই নির্ধারণ করেছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
“মু’মিন পুরুষ আর মু’মিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, নামায ক্বায়িম করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহা প্রজ্ঞাবান।” (সূরা আত-তাওবা: ৭১)
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর অবস্থান-
- নারী একজন পূর্ণ মানবসত্তা, কোনোভাবেই অধস্তন নয়
- তার চিন্তা, মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব স্বীকৃত
- সমাজ ও পরিবার গঠনে নারীর ভূমিকা অপরিহার্য
- নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধে নারী সমানভাবে অংশীদার
ইসলামে নারীর সামাজিক ভূমিকা
ইসলাম নারীকে কেবল পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করেনি; বরং তাকে সমাজ গঠনের একটি অপরিহার্য ও সম্মানজনক অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ উভয়েই আল্লাহর কাছে সমান মর্যাদাসম্পন্ন এবং সমাজের কল্যাণে উভয়ের দায়িত্ব ও ভূমিকা রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
১. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ
ইসলাম নারীকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করেছে। সে উপার্জন করতে পারে, সম্পত্তির মালিক হতে পারে এবং ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। এর উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন হযরত খাদিজা (রা.)। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরব সমাজের অন্যতম সফল ও সম্মানিত ব্যবসায়ী। তাঁর সততা, বুদ্ধিমত্তা ও পেশাদারিত্ব শুধু তাঁকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভরই করেনি, বরং সমাজে নারীর মর্যাদা ও সক্ষমতার একটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ইসলামের সূচনালগ্নে তাঁর আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন নবী মুহাম্মদ (সা.) এর দাওয়াতি কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় নারীর ভূমিকা
ইসলাম শিক্ষা অর্জনকে নারী-পুরুষ সবার জন্য ফরজ করেছে। ইসলামের ইতিহাসে নারীরা কেবল শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়, বরং শিক্ষক ও জ্ঞানবিতরণকারী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইসলামী জ্ঞান, হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরের অন্যতম প্রধান উৎস। বহু সাহাবি ও তাবেয়ি তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। তাঁর জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা ইসলামী শিক্ষার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং প্রমাণ করে যে ইসলাম নারীকে জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে।
৩. সামাজিক ও মানবকল্যাণমূলক ভূমিকা
ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীরা সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা, রোগীদের পরিচর্যা, দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা, এমনকি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যেমনরুফাইদা আল-আসলামিয়া (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম নারী চিকিৎসক, যিনি আহতদের চিকিৎসা ও সেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এছাড়াও নারীরা দাওয়াহ কার্যক্রম, নৈতিক শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
ইসলামে নারীর প্রতি সহিংসতা ও জুলুমের অবস্থান
ইসলামে একজন মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় নারীদের প্রতি তার আচরণের মাধ্যমে। ইসলাম নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন ও অবমাননাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো নারীর সঙ্গে ন্যায়, দয়া ও সম্মানপূর্ণ আচরণ করা। কোনো অবস্থাতেই নারীর ওপর জুলুম করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং এটি স্পষ্ট গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।
আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোন সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো।” (জামে’ আত-তিরমিজি: ৩৮৯৫)
কন্যাসন্তান হিসেবে নারীর মর্যাদা: রহমতের প্রতীক
ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান কোনো বোঝা নয়; বরং সে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত ও রহমত। যে সমাজ একসময় কন্যাকে লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের কারণ মনে করত, ইসলাম সেই সমাজের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এনে কন্যাসন্তানকে জান্নাতের পথ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
আমর আন্ নাকিদ (রহঃ)….আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুটি মেয়ে সন্তানকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিনে সে ও আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকব, এ বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে দিলেন।” (সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)
ইসলাম কন্যাসন্তানকে অবহেলা নয়, বরং সম্মান, সুরক্ষা ও ভালোবাসার অধিকার দিয়েছে। তাই সমাজে কন্যা অবমূল্যায়নের যেকোনো ধারণা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যা কোনো বোঝা নয়; সে রহমত, বরকত ও জান্নাতের পথপ্রদর্শক।
স্ত্রী হিসেবে নারীর অধিকার ও সম্মান
ইসলাম স্ত্রীর মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ অবস্থানে স্থাপন করেছে। দাম্পত্য সম্পর্ককে ইসলাম কেবল সামাজিক বন্ধন হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের এক পবিত্র চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেন দয়া, সহযোগিতা ও ন্যায়বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এটাই ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম স্ত্রীর জন্য সুস্পষ্ট অধিকার নির্ধারণ করেছে। স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈধভাবে তার ভরণপোষণ ও মোহর আদায় করা। এসব দায়িত্ব কোনো দয়া নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত ফরজ কর্তব্য।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন-
“হে ঈমানদারগণ! জোরপূর্বক নারীদের ওয়ারিশ হওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয় আর তাদেরকে দেয়া মাল হতে কিছু উসূল করে নেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করবে না, যদি না তারা সুস্পষ্ট ব্যভিচার করে। তাদের সাথে দয়া ও সততার সঙ্গে জীবন যাপন কর, যদি তাদেরকে না-পছন্দ কর, তবে হতে পারে যে তোমরা যাকে না-পছন্দ করছ, বস্তুতঃ তারই মধ্যে আল্লাহ বহু কল্যাণ দিয়ে রেখেছেন।” (সূরা নিসা: ১৯)
ইসলামে একজন মানুষের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার পারিবারিক আচরণের মাধ্যমে, বিশেষত স্ত্রীর প্রতি তার আচরণ কেমন তার ওপর ভিত্তি করেই। ইসলাম কখনোই স্ত্রীকে অবহেলা বা নির্যাতনের অনুমতি দেয়নি; বরং তাকে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ অধিকার দিয়েছে।
মা হিসেবে নারীর অতুলনীয় মর্যাদা
ইসলামে মায়ের মর্যাদা এমন এক উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে, যা পৃথিবীর কোনো সম্পর্কের সঙ্গে তুলনীয় নয়। একজন সন্তানের জীবনে মায়ের অবদান, ত্যাগ ও ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই আর ইসলাম এই ত্যাগকেই সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে, (নির্দেশ দিচ্ছি) যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (তোমাদের সকলের) প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে।” (সূরা লুকমান: ১৪)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“তিনি বলেন, এক লোক রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহ্র রসূল! আমার নিকট কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার? তিনি বললেনঃতোমার মা। লোকটি বললোঃ অতঃপর কে? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃতোমার মা। সে বললোঃ অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললোঃ অতঃপর কে? তিনি বললেনঃঅতঃপর তোমার বাবা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১)
সন্তান জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে লালন-পালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে মায়ের অবদান অতুলনীয়। তাই ইসলাম সন্তানের জন্য মায়ের সেবা, সম্মান ও আনুগত্যকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারকে ইসলাম শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই ইসলামে মায়ের সম্মান মানে কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি এক মহান ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ।
শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও দায়িত্ব
ইসলাম জ্ঞানার্জনকে মানুষের মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করেছে। অজ্ঞতাকে অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করে ইসলাম মানুষকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এই নির্দেশ কেবল পুরুষের জন্য নয়; নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যক্তির সমতুল্য।” (সহিহ বুখারী: ৫৯৭১)
নারীর শিক্ষাগত দায়িত্বসমূহ-
- নিজে জ্ঞান অর্জন করা ও আত্মউন্নয়নে সচেষ্ট থাকা
- সন্তানদের নৈতিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় দিকনির্দেশনা দেওয়া
- পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শিক্ষার ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করা
- কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও ভুল ধারণা দূর করতে সচেতন ভূমিকা পালন করা
- সমাজে নৈতিকতা, শালীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা
অর্থনৈতিক অধিকার ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান
ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বা পরনির্ভরশীল করে রাখেনি; বরং তাকে স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার প্রদান করেছে। সম্পত্তি অর্জন, ভোগ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ইসলাম সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় ইসলামের নীতি ছিল যুগান্তকারী ও ন্যায়ভিত্তিক।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন-
“মাতা-পিতা এবং আত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ রয়েছে; আর মাতা-পিতা এবং আত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক আর বেশিই হোক, এক নির্ধারিত অংশ।” (সূরা আন-নিসা: ৭)
ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেনি; বরং নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। কুরআনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তান-সন্ততির (অংশ) সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, পুরুষ দুই নারীর অংশের সমান পাবে, তবে সন্তান-সন্ততি যদি শুধু দু’জন নারীর অধিক হয় তাহলে তাঁরা রেখে যাওয়া সম্পত্তির তিন ভাগের দু’ ভাগ পাবে, আর কেবল একটি কন্যা থাকলে সে অর্ধেক পাবে এবং তার পিতা-মাতা উভয়ের প্রত্যেকে রেখে যাওয়া সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে যদি তার সন্তান থাকে, আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিশ মাতা-পিতাই হয়, সে অবস্থায় তার মাতার জন্য এক তৃতীয়াংশ, কিন্তু তার ভাই-বোন থাকলে, তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ, (ঐসব বণ্টন হবে) তার কৃত ওয়াসীয়াত অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমরা জান না তোমাদের পিতা এবং সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের পক্ষে উপকারের দিক দিয়ে অধিকতর নিকটবর্তী। (এ বণ্টন) আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাশীল।” (সূরা আন-নিসা: ১১)
সম্মান ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা
ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। নারী যেন কোনোভাবে অপমান, নির্যাতন বা অবমাননার শিকার না হয় এ বিষয়টি নিশ্চিত করাই ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য। শারীরিক, মানসিক কিংবা সামাজিক যেকোনো ধরনের নিপীড়ন ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন-
“আর যারা মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় তাদের কোন অপরাধ ছাড়াই, তারা অপবাদের ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৮)
ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তাকে মানবাধিকারের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। নারীর প্রতি যে কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ ইসলামের নীতির পরিপন্থী। তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে নারীর মর্যাদা রক্ষা করা অপরিহার্য।
নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তায় ইসলামের ভূমিকা-
- ইসলাম নারীকে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছে
- নারীকে অপমান, নির্যাতন ও অবহেলা করা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে
- নারীকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়াকে ইসলামের মৌলিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে
- কন্যাশিশু হত্যা ও নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে
- নারীকে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে
- বিবাহে নারীর সম্মতি বাধ্যতামূলক করেছে
- মোহরকে নারীর বৈধ অধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে
- নারীকে শিক্ষা গ্রহণ ও আত্মমর্যাদা রক্ষার অধিকার দিয়েছে
- পরিবারে মা, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে
- সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে
পর্দা ও শালীনতা: মর্যাদা রক্ষার সুরক্ষা, দমন নয়
পশ্চিমা বিশ্বে অনেক সময় পর্দাকে নারীর স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইসলাম নারীকে নিজের শরীর ও মর্যাদা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিয়েছে। পর্দা কোনো জবরদস্তি নয়; বরং এটি নারীর পছন্দ, আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। যেখানে পশ্চিমা সমাজে নারীর সৌন্দর্যকে পণ্যে পরিণত করা হয়, সেখানে ইসলাম নারীকে দৃষ্টি ও লালসার বস্তু না বানিয়ে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। পর্দা নারীর স্বাধীনতাকে খর্ব করে না; বরং তাকে নিরাপত্তা, সম্মান ও আত্মপরিচয়ের নিশ্চয়তা দেয়।
ইসলামে পর্দা নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এটি তার সম্মান, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিত্ব রক্ষার এক সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা। পর্দার মূল উদ্দেশ্য নারীকে আড়াল করা নয়, বরং তাকে অবমাননা, দৃষ্টি-লালসা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও বিশ্বাসীদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়।[১] এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।[২] আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
(সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
ইসলামের ইতিহাসে নারীদের অবদান
ইসলামের ইতিহাস শুধু পুরুষ সাহাবিদের বীরত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নারীরাও ইসলামের বিস্তার, সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁরা ছিলেন কখনো বিশ্বাসের প্রথম সমর্থক, কখনো জ্ঞানের বাহক, আবার কখনো যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সৈনিক। ইসলামের ইতিহাসে যেসব নারী সাহাবি ও মহীয়সী নারীরা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের ভূমিকা আজও মানবজাতির জন্য অনুপ্রেরণা।
১. হযরত খাদিজা (রা.)
হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম নারী মুসলমান এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে বড় সমর্থক। নবুয়তের শুরুতে যখন সমাজ নবীজিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন তিনিই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা। তিনি নিজের সম্পদ, সম্মান ও জীবনের সবকিছু ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন। ইসলামের প্রাথমিক প্রচার তাঁর আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা ছাড়া প্রায় অসম্ভব হতো। তাঁর দৃঢ়তা ও বিশ্বাস ইসলামের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে তোলে।
২. হযরত আয়েশা (রা.)
হযরত আয়েশা (রা.) ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে জ্ঞানী নারীদের একজন। তিনি ছিলেন নবীজি ﷺ–এর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যপ্রাপ্ত স্ত্রী এবং ইসলামি জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার। তিনি দুই হাজারেরও বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং বহু সাহাবি ও তাবেয়ী তাঁর কাছ থেকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করেছেন। ফিকহ, তাফসির ও হাদিসে তাঁর অবদান আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য পথনির্দেশক।
৩. হাফসা বিনতে উমর (রা.)
হাফসা (রা.) ছিলেন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর কন্যা এবং রাসূল ﷺ–এর স্ত্রী। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন। খলিফা আবু বকর (রা.) এর সময় সংকলিত কুরআনের লিখিত সংরক্ষণ তাঁর কাছেই রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সংরক্ষিত কপি থেকেই উসমান (রা.) এর যুগে কুরআনের মানক নুসখা প্রস্তুত হয়। এটি তাঁর আমানতদারিতা ও সততার অনন্য প্রমাণ।
৪. আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)
হিজরতের সময় আসমা (রা.) অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি গোপনে রাসূল ﷺ ও তাঁর পিতা আবু বকর (রা.) এর কাছে খাবার পৌঁছে দিতেন, যদিও এতে তাঁর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। এই ত্যাগের জন্য তাঁকে “জাতুন নিতাকাইন” (দুটি কোমরবন্ধনীধারিণী) উপাধি দেওয়া হয়। তাঁর সাহসিকতা ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৫. উম্মে উমারা (নুসাইবা বিনতে কা‘ব)
উম্মে উমারা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম সাহসী নারী যোদ্ধা। উহুদ যুদ্ধে তিনি নিজ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে রাসূল ﷺ কে রক্ষা করেন। তিনি আহত হয়েও যুদ্ধ চালিয়ে যান। তাঁর সাহসিকতা প্রমাণ করে যে প্রয়োজনের সময় ইসলামে নারীও প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারে।
৬. রুফাইদা আল-আসলামিয়া
রুফাইদা (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম পরিচিত নারী চিকিৎসক ও সেবিকা। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সাহাবিদের চিকিৎসা করতেন এবং নবীজি ﷺ এর অনুমতিতে মসজিদের পাশে চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনা করতেন। তিনি চিকিৎসা, মানবসেবা ও নার্সিং পেশার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত।
৭. ফাতিমা আল-ফিহরি
ফাতিমা আল-ফিহরি ছিলেন এক অনন্য মুসলিম নারী, যিনি ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ নগরীতে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় আল-কারাউইন প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান আজও শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রতীক হিসেবে টিকে আছে। তাঁর উদ্যোগ প্রমাণ করে যে মুসলিম নারীরা শুধু শিক্ষার্থীই নন, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
ইসলামে নারীর মর্যাদা নিয়ে ভুল ধারণার মূল কারণসমূহ
ইসলাম নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। তবুও সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এসব ভ্রান্ত ধারণার মূল কারণ ইসলাম নয়; বরং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভুল ব্যাখ্যা।
১. ধর্মীয় অজ্ঞতা: অনেকেই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা না জেনে সামাজিক রীতিনীতিকেই ধর্ম ভেবে নেয়। ফলে ইসলামকে দায়ী করা হয় এমন আচরণের জন্য, যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই।
২. সংস্কৃতি ও ধর্মের গুলিয়ে ফেলা: বহু সমাজে প্রাচীন কুসংস্কার ও স্থানীয় রীতিনীতিকে ইসলামের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবে ইসলাম অনুমোদন করে না। এই বিভ্রান্তিই নারীর প্রতি অবিচারের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৩. ভুল বা খণ্ডিত ব্যাখ্যা: কুরআন ও হাদিসের নির্দিষ্ট আয়াত বা বাণী প্রসঙ্গহীনভাবে উপস্থাপন করলে ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি বিকৃত হয়ে যায়। ফলে নারীর অধিকার সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়।
৪. পশ্চিমা মিডিয়ার প্রভাব: অনেক সময় গণমাধ্যমে ইসলামকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে কিছু সমাজের ত্রুটিপূর্ণ আচরণকে ইসলামের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। এতে করে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা আড়ালে পড়ে যায়।
ইসলাম কখনোই নারীর অধিকার খর্ব করেনি; বরং নারীর প্রতি অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। সমস্যার মূল ইসলাম নয়, বরং তার ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল প্রয়োগ।
আধুনিক নারীবাদ বনাম ইসলামী নারীবোধ
- আধুনিক নারীবাদ নারী-পুরুষ সম্পর্ককে প্রায়শই প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করে, যেখানে পারিবারিক ভারসাম্য ও পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে।
- ইসলামী নারীবোধ নারী ও পুরুষকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে দায়িত্ব ও অধিকার ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টিত।
- আধুনিক নারীবাদে ব্যক্তিস্বাধীনতা মুখ্য হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে তোলে।
- ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি নারীর ব্যক্তিসত্তা, সম্মান ও মর্যাদাকে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি পরিবারকে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
- আধুনিক নারীবাদে সমতার ধারণা প্রায়ই অভিন্ন ভূমিকার দাবি করে, পক্ষান্তরে ইসলামী নারীবোধ ন্যায্যতা, সক্ষমতা ও প্রকৃতিগত পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে।
- ইসলামী নারীবোধ নারীর শিক্ষা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও নৈতিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করে, তবে তা পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে।
উপসংহার
ইসলামে নারীর মর্যাদা কোনো সাময়িক সামাজিক ধারণা নয়; বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক এক সুসংহত, ন্যায়নিষ্ঠ ও মানবিক জীবনব্যবস্থা। ইসলাম নারীকে কেবল অধিকার প্রদান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাকে সম্মান, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার সর্বোচ্চ স্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই নারীর ভূমিকা ইসলাম সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তা সংরক্ষণের জন্য নৈতিক ও কাঠামোগত নির্দেশনা প্রদান করেছে। অন্যদিকে পশ্চিমা সমাজে নারীর স্বাধীনতার ধারণা অনেক সময় ভোগবাদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, যেখানে বাহ্যিক স্বাধীনতা থাকলেও নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও নিরাপত্তা উপেক্ষিত হয়। কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম কিংবা সংস্কৃতিতে নারীকে প্রায়ই পণ্যরূপে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবে তার মানবিক অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন এখানে নারীকে ভোগের বস্তু নয়, বরং সম্মানিত মানুষ হিসেবে দেখা হয়।
ইসলামী জীবনব্যবস্থাই নারীর প্রকৃত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকারের সবচেয়ে সুসংহত ও টেকসই সমাধান প্রদান করে।