
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও নৈতিক আচরণ পর্যন্ত সবকিছুকে পরিচালিত করে। প্রত্যেক নবী-রাসূলের প্রথম দাওয়াত ছিল ঈমানের দাওয়াত। ঈমান ব্যতীত বান্দার কোন আমল আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। ঈমানের উপর নির্ভর করেই বান্দার জান্নাত-জাহান্নাম ও পরকালীন মুক্তি। ঈমান ছাড়া ইসলামের কোনো শিক্ষা পূর্ণতা পায় না এবং কোনো আমলই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয় না।
একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, চরিত্র, নৈতিকতা ও জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে ঈমান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঈমানই মানুষকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য শেখায়, সত্যের পথে অবিচল রাখে এবং আল্লাহর প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই বলা যায়, ইসলামের মূল শক্তি ও ভিত্তি হলো ঈমান,যা ছাড়া একজন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
ঈমানের প্রকৃত অর্থ ও বাস্তব ব্যাখ্যা
ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্বাস করা বা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করা। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ঈমানের অর্থ কেবল মুখে বিশ্বাস প্রকাশ করাই নয়। বরং ঈমান হলো হৃদয়ের গভীর থেকে বিশ্বাস করা, সেই বিশ্বাস মুখে স্বীকার করা এবং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যদি শুধু মুখে বলে যে সে মুসলমান, কিন্তু তার চিন্তা, আচরণ ও কাজের মধ্যে ইসলামের কোনো ছাপ না থাকে, তাহলে তাকে পূর্ণ ঈমানদার বলা যায় না। ইসলামে ঈমানের কিছু নির্দিষ্ট ভিত্তি রয়েছে, যেগুলো ছাড়া ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না। এই ভিত্তিগুলোকেই বলা হয় ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ।
১। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস– তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তিনিই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং সবকিছু তাঁর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়।
২। ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস– আল্লাহ যাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আদেশ বাস্তবায়নের জন্য। তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন, যেমন ওহি পৌঁছে দেওয়া, আমল লিপিবদ্ধ করা ইত্যাদি।
৩। আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস– আল্লাহ বিভিন্ন সময়ে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যে কিতাবগুলো নাজিল করেছেন, সেগুলোর ওপর ঈমান আনা। এর মধ্যে সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হলো পবিত্র কুরআন, যা মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত হিদায়াত।
৪। রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস– আল্লাহ যাদেরকে মানুষের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে সত্য জেনে বিশ্বাস করা। শেষ নবী হিসেবে হযরত মুহাম্মদ ﷺ কে মানা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৫। কিয়ামতের দিনে বিশ্বাস– একদিন সমস্ত মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং তাদের কাজের হিসাব নেওয়া হবে। সেই দিনের বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল ও সচেতন জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
৬। তাকদিরে বিশ্বাস– ভালো ও মন্দ সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও জ্ঞানের আওতায় ঘটে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ দায়মুক্ত; বরং মানুষ চেষ্টা করবে, আর ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দেবে।
এই ছয়টি বিষয়ের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসই একজন মানুষের ঈমানকে পূর্ণতা দেয়। যখন এগুলো অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মে সত্যিকারের পরিবর্তন আসে।
ঈমান ও আমলের সম্পর্ক
ইসলামে ঈমান ও আমল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এ দুটির সম্পর্ক এমন যে, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। ঈমান হলো মূল ভিত্তি, আর আমল হলো তার বাস্তব প্রকাশ। শুধু ঈমানের দাবি করলেই যথেষ্ট নয়, যদি সেই ঈমানের প্রতিফলন কাজে না দেখা যায়, তবে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
যেমন ধরুন, যদি ১০০০ সংখ্যার শুরুতে থাকা ১ বাদ দেওয়া হয়, তাহলে বাকি তিনটি শূন্যের আর কোনো মূল্য থাকে না। ঠিক তেমনি, ঈমান ছাড়া যত ভালো কাজই করা হোক না কেন, আল্লাহর কাছে সেই কাজের প্রকৃত কোনো মূল্য থাকে না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
“যারা ঈমান আনে আর সৎ কাজ করে, আমি তার কর্মফল বিনষ্ট করি না।” (সূরা আল-কাহফ: ৩০)
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত-
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কোন্ ‘আমলটি উত্তম?’ তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’ প্রশ্ন করা হল, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেনঃ ‘মাকবূল হাজ্জ সম্পাদন করা। (সহীহ বুখারী: ২৬)
ঈমান ও আখিরাতের সফলতার সম্পর্ক
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত সফলতা দুনিয়াতে নয়, বরং আখিরাতে। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। আর এই চিরস্থায়ী জীবনের সফলতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে মানুষের ঈমানের ওপর। ঈমান ছাড়া আখিরাতে কোনো সফলতা নেই এটাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং রাসূলের দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করে, তার জন্য আখিরাতে রয়েছে চিরস্থায়ী শান্তি ও পুরস্কার।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন-
“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। তাদেরকে যখনই ফলমূল খেতে দেয়া হবে, তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে পূর্বে জীবিকা হিসেবে যা দেয়া হতো, এতো তারই মতো। একই রকম ফল তাদেরকে দেয়া হবে এবং সেখানে রয়েছে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিণী, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫)
আখিরাতে মানুষের সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদা কোনো কাজে আসবে না। সেদিন একমাত্র মূল্যায়ন হবে সে কতটা ঈমানের সাথে জীবন যাপন করেছে এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলেছে কি না। যে ব্যক্তি ঈমানের ওপর অটল থাকে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই কল্যাণ নির্ধারণ করেন।
ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি একজন মুসলমানের ধর্মীয় জীবনের মূল ভিত্তি। ঈমান ছাড়া ইসলামের কোনো বিধানই পূর্ণতা পায় না। মানুষের বিশ্বাস, আচরণ ও কর্ম সবকিছুর মূল চালিকাশক্তি হলো ঈমান।
নিচে ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে তুলে ধরা হলো-
১. আখিরাতের মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি
ইসলামের দৃষ্টিতে আখিরাতে সফল হওয়ার একমাত্র উপায় হলো ঈমান। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারাই জান্নাত লাভ করবে। ঈমান ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
“আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পূণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পূণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমানও নেকী থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।” (সহিহ বুখারী : ৪৪)
২. মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক শান্তির উৎস
ঈমান মানুষের মনে এক ধরনের আত্মিক শান্তি এনে দেয়। একজন মুমিন বিশ্বাস করে সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। তাই দুঃখ-কষ্ট, বিপদ বা পরীক্ষার সময় সে ভেঙে পড়ে না; বরং ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। এই বিশ্বাসই মানুষের মনকে অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে এবং তাকে স্থির ও শান্ত রাখে।
৩. সৎ ও নৈতিক জীবন গঠনে ঈমানের ভূমিকা
ঈমান শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে ঈমান গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাআলা তার অভিভাবক হয়ে যান। এমন ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে থাকে এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে আল্লাহর রহমত লাভ করে। ঈমান মানুষকে সত্যবাদী, দায়িত্বশীল ও ন্যায়পরায়ণ করে তোলে। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
“যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরি করে, তাদের অভিভাবক তাগুত; তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, তারা তাতেই চিরকাল থাকবে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৭)
৪. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের মাধ্যম
ঈমান মানুষের অন্তরকে আল্লাহর সাথে যুক্ত করে দেয়। যখন একজন বান্দা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর রুবুবিয়্যাহ, উলুহিয়্যাহ ও আসমা-সিফাতের প্রতি ঈমান আনে তখন তার চিন্তা, কাজ ও উদ্দেশ্য আল্লাহমুখী হয়ে যায়। এর ফলেই সে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের পথে অগ্রসর হয়।
আল্লাহর নৈকট্য মানে-
- আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন
- দো‘আ কবুল হওয়া
- অন্তরের প্রশান্তি লাভ
- গুনাহ থেকে রক্ষা
- আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
“অবশ্যই যে তার অঙ্গীকার পালন করে এবং সংযত হয়ে চলে, নিশ্চয় আল্লাহ সংযমীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান: ৭৬)
৫. পাপ থেকে সুরক্ষা ও আত্মসংযমের শক্তি
ঈমান মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে। সে জানে আল্লাহ সবকিছু দেখেন এবং প্রতিটি কাজের হিসাব নেবেন। এই বিশ্বাস মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং আত্মসংযমী করে তোলে।
৬. ঈমান ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঈমান। মানুষের পরকালীন মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি। কুরআন ও সহীহ হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেসব মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস রেখে মৃত্যুবরণ করবে, তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না, যদিও তাদের আমলে গুনাহ থেকে যেতে পারে।
আবূ সা‘ঈদ খুদ্রী (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ্ বলবেন, যার অন্তঃকরণে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকে বের কর। অতঃপর তাদেরকে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে তারা পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। তাদেরকে জীবন-নদে নামিয়ে দেয়া হবে। এতে তারা তর-তাজা হয়ে উঠবে যেমন নদী তীরে জমাট আবর্জনায় সজীব উদ্ভিদ গজিয়ে ওঠে। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বললেনঃ তোমরা কি দেখ না সেগুলো হলুদ রঙের হয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে উঠতে থাকে?” (সহিহ বুখারী : ৬৫৬০)
ঈমান দুর্বল হওয়ার কারণসমূহ
ঈমান মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু নানা কারণে এই ঈমান ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না কোন অভ্যাস বা আচরণ তার ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ঈমান দুর্বল হওয়ার প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো-
১. আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল হওয়া
ঈমান দুর্বল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। যখন মানুষ নামাজ, দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে যায়। আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা মানেই ঈমানের আলো নিভে যাওয়া।
২. নামাজ ও ফরজ ইবাদতে অবহেলা
নামাজ ঈমানের মূল স্তম্ভ। নিয়মিত নামাজ আদায় না করলে মানুষের অন্তরে গাফিলতি জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। ফরজ ইবাদতে অবহেলা করা মানে আল্লাহর আদেশকে গুরুত্ব না দেওয়া, যা ঈমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
৩. গুনাহে লিপ্ত থাকা ও তওবা না করা
বারবার গুনাহ করা এবং তওবা না করা ঈমানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। গুনাহ মানুষের অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি করে, যার ফলে হালাল-হারামের পার্থক্যও অস্পষ্ট হয়ে যায়। ছোট গুনাহকে তুচ্ছ ভাবাও ঈমান দুর্বল হওয়ার বড় কারণ।
৪. খারাপ সঙ্গ ও নেতিবাচক পরিবেশ
মানুষ তার সঙ্গীর প্রভাবেই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। যারা আল্লাহভীরু নয়, দ্বীনের প্রতি উদাসীন তাদের সঙ্গ ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। খারাপ বন্ধু ধীরে ধীরে মানুষকে গুনাহের পথে টেনে নেয় এবং নেক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ মিস্ক বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতাদের থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না। হয় তুমি আতর খরিদ করবে, না হয় তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কর্মকারের হাপর হয় তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে।” (সহিহ বুখারী : ২১০১)
৫. দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি
যখন মানুষ দুনিয়াকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে, তখন আখিরাত তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যায়। সম্পদ, পদমর্যাদা ও ভোগবিলাসে অতিরিক্ত আসক্তি ঈমানকে দুর্বল করে দেয় এবং মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৬. দ্বীনি জ্ঞানের অভাব
ইসলামের সঠিক জ্ঞান না থাকলে মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়। কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা ঈমানকে নড়বড়ে করে তোলে। দ্বীনি জ্ঞান না থাকলে মানুষ ভুল ও সঠিকের পার্থক্য করতে পারে না।
৭. মৃত্যুর কথা ভুলে যাওয়া
যে ব্যক্তি মৃত্যু ও আখিরাতের কথা ভুলে যায়, তার অন্তরে গাফিলতি বাসা বাঁধে। মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে ঈমানের পথে দৃঢ় রাখে, আর তা ভুলে গেলে দুনিয়ার মোহ বেড়ে যায়।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে তোমরা খুব কমই হাসতে এবং খুব বেশি কাঁদতে।” (সহিহ বুখারী : ৬৪৮৬)
দুনিয়ার ফিতনা ও ঈমান রক্ষার কৌশল
বর্তমান যুগকে অনেক আলেমই “ফিতনার যুগ” বলে উল্লেখ করেছেন। চারপাশে এমন অসংখ্য বিষয় ছড়িয়ে আছে, যা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয় কখনো অজান্তেই, আবার কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে। দুনিয়ার মোহ, অবাধ স্বাধীনতার নামে পাপের সহজলভ্যতা, সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার সব মিলিয়ে ঈমান রক্ষা করা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে সে নিজের ঈমানকে অটুট রাখবে। একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজের ঈমানকে নিয়মিত পরিচর্যা করা এবং তাকে শক্তিশালী রাখা।
ঈমান মজবুত করার কিছু কার্যকর ও বাস্তব উপায় তুলে ধরা হলো-
১. নিয়মিত নামাজ আদায় করা
নামাজ হলো ঈমানের মূল ভিত্তি ও স্তম্ভ। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে মানুষের অন্তর আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং আত্মিক শক্তি জোগায়। যিনি নামাজে যত যত্নবান, তার ঈমান তত মজবুত হয়।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত-
তিনি আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন, “বলতো যদি তোমাদের কারো বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তাঁর দেহে কোন ময়লা থাকবে? তারা বললেন, তাঁর দেহে কোনরূপ ময়লা বাকী থাকবে না। আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদহারণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলা বান্দার গুনাহসমুহ মিটিয়ে দেন।” (সহিহ বুখারী : ৫২৮)
২. কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন
কুরআন হলো ঈমানের খাদ্য। শুধু তিলাওয়াত করাই নয়, কুরআনের অর্থ বুঝে পড়লে হৃদয়ে আলোর সৃষ্টি হয়। নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন মানুষের চিন্তা ও আচরণকে শুদ্ধ করে এবং ঈমানকে গভীর করে তোলে।
৩. আল্লাহর জিকির ও দোয়া করা
আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে। সকাল-সন্ধ্যার যিকির, ইস্তিগফার ও দোয়া মানুষকে গুনাহ থেকে রক্ষা করে এবং ঈমানকে দৃঢ় রাখে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে, আল্লাহও তাকে তাঁর রহমতের ছায়ায় রাখেন।
আবূ দারদা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত-
“নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি কি তোমাদের আমলসমূহের সর্বোত্তমটি সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করবো না, যা তোমাদের প্রভুর নিকট সরবাধিক প্রিয়, তোমাদের মর্যাদা অধিক উন্নীতকারী, তোমাদের সোনা-রুপা দান করার চেয়ে এবং যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তোমাদের শত্রুদের হত্যা করা এবং তোমাদের নিহত হওয়ার চেয়ে উত্তম? সাহাবীগণ বলেনঃ ‘ইয়া রাসূলআল্লাহ! সেটি কি? তিনি বলেনঃ আল্লাহর যিকির। মুআয বিন জাবাল (রাঃ) বলেন, কোনো মানুষের জন্য আল্লাহর যিকিরের চেয়ে উত্তম আমল নাই, যা তাকে মহামহিম আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৯০)
৪. সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা
মানুষ তার সঙ্গের প্রভাবে গড়ে ওঠে। সৎ ও দ্বীনদার মানুষের সঙ্গে থাকলে ঈমান দৃঢ় হয়, আর খারাপ সঙ্গ ঈমান দুর্বল করে। তাই সবসময় চেষ্টা করা উচিত নেককার ও আল্লাহভীরু মানুষের সান্নিধ্যে থাকার।
৫. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও তাওবা করা
গুনাহ ঈমানের সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রতিটি গুনাহ হৃদয়ে অন্ধকার সৃষ্টি করে। তাই সচেতনভাবে গুনাহ এড়িয়ে চলা এবং ভুল হলে দ্রুত তাওবা করা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ক্ষমা করে দেন।
আনাস (রাঃ) , হতে বর্ণিত-
“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ প্রত্যেক আদম সন্তানই গুনাহগার। আর গুনাহগারদের মধ্যে তওবাকারীগণ উত্তম।” (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৫১)
৬. দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আখিরাতমুখী হওয়া
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চূড়ান্ত লক্ষ্য বানায়, তার ঈমান দুর্বল হয়ে যায়। আর যে আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়াকেও সহজ করে দেন। তাই জীবনের প্রতিটি কাজে আখিরাতের কথা স্মরণ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-
“তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়া মুমিনের জন্য কয়েদখানা [কারাগার] এবং কাফিরের জন্য জান্নাততুল্য।” (সহীহ মুসলিম: ২৯৫৬)
৭. দ্বীনি জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হওয়া
ঈমান তখনই শক্ত হয়, যখন তার ভিত্তি মজবুত হয়। আর এই দৃঢ়তা অর্জিত হয় সঠিক দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। কুরআন, হাদীস ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকলে মানুষের ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সে সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হয়।
হুমায়দ ইব্নু ‘আবদুর রহমান (রহঃ) হতে বর্ণিত-
“তিনি বলেনঃ আমি মু’আবিয়াহ (রাঃ)-কে খুৎবায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের ‘ইল্ম দান করেন। আমি তো বিতরণকারী মাত্র, আল্লাহই (জ্ঞান) দাতা। সর্বদাই এ উম্মাত কিয়ামাত পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমের উপর কায়িম থাকবে, বিরোধিতাকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (সহিহ বুখারী : ৭১)
ঈমানই জীবনের প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি
যুগে যুগে সমাজে নানাবিধ খারাপ কাজ বিদ্যমান থাকলেও প্রত্যেক নবী-রাসূলের প্রথম দাওয়াত ছিল ঈমানের।
মহান আল্লাহ বলেন,“আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল পাঠাইনি, যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর’।” (সূরা আম্বিয়া: ২৫)
তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে শরী‘আত ভিন্ন ভিন্ন থাকলেও সকল নবীকে তাওহীদ (তথা ঈমান) দিয়ে পাঠানো হয়েছে।
“আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নাই।’ (তোমরা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে) মহাদিনে আমি তোমাদের জন্য শাস্তির আশঙ্কা করি।” (সূরা আ‘রাফ: ৫৯)
ঈমানই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, ঈমানই তার শক্তি এবং ঈমানই তার মুক্তির একমাত্র পথ। যে ব্যক্তি ঈমানকে নিজের জীবনের মূল ভিত্তি বানাতে পারে, সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সফলতা লাভ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খাঁটি ও দৃঢ় ঈমানের উপর জীবন অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।