হালাল.
হালাল” একটি আরবি শব্দ যার অর্থ বৈধ, উপকারী ও কল্যাণ ইত্যাদি। মানুষের জন্য যা কিছু উপকারী ও কল্যাণকর ওই সকল কাজ ও বস্তুকে আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য হালাল বা বৈধ করে দিয়েছেন। এর বিপরীত হলো হারাম। কোন উপার্জন, কোন খাদ্য এবং কোন কর্ম মুসলমানদের জন্য হালার তা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। অর্থাৎ পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে যে সব বিষয়কে ইসলামে বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে ইসলামি পরিভাষায় সেগুলো হালাল।
জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ কর। কেননা কোন ব্যক্তিই তার জন্য নির্ধারিত রিযিক পূর্ণরূপে না পাওয়া পর্যন্ত মরবে না, যদিও তার রিযিক প্রাপ্তিতে কিছু বিলম্ব হয়। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ কর, যা হালাল তাই গ্রহন কর এবং যা হারাম তা বর্জন কর। [২১৪৪]
[২১৪৪] হাদিসটি ইমাম ইবনু মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। আত-তালীকুর রাগীব ৩/৭, সহিহাহ ২৬০৭, মিশকাত ৩৫০০। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ। উক্ত হাদিসের রাবী মুহাম্মাদ ইবনুল মুসাফফা আল-হিমসী সম্পর্কে আবু হাতিম আর-রাযী ও ইমাম নাসাঈ বলেন, তিনি সত্যবাদী। ইবনু হিব্বান তাকে সিকাহ বললেও অন্যত্র বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় ভুল করেন। ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি সত্যবাদী তবে হাদিস বর্ণনায় সন্দেহ ও তাদলীস করেন। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৫৬১৩, ২৬/৪৬৫ নং পৃষ্ঠা)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা পাক–পবিত্র; তিনি একমাত্র পাক–পবিত্র বস্তুকেই কবুল করেন। (এবং সর্বক্ষেত্রে পাক–পবিত্রতার আদেশই তিনি করিয়াছেন। সেই সম্পর্কে) আল্লাহ্ রাসূল গণকে যেই আদেশ করিয়াছেন, মু’মিনগণকেও সেই আদেশই করিয়াছেন। যথা—রাসূলগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন : “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ হতে (যা ইচ্ছা) খাও ও সৎকর্ম কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আমি সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।”সূরা আল-মু’মিনূন (২৩:৫১)
মু’মিনগণকে লক্ষ্য করিয়াও তদ্রূপই বলিয়াছেন :
“হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে এবং আল্লাহর জন্য শোকর কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর।সূরাঃ আল-বাকারা আয়াতঃ ১৭২”
অতঃপর রাসুলুল্লাহ্ (ছাঃ) উল্লেখ করিলেন— এক ব্যক্তি দূর–দূরান্তের সফর করিতেছে, ( মুসাফিরের দোআ সাধারণত বেশী কবুল হয় এবং তাহার মাথার চুল এলোমেলো, শরীরে ধুলা–বালু। (অর্থাৎ, করুণ অবস্থা—যাহার দো’আ সহজে কবুল হয়।) এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি উভয় হস্ত আসমানের দিকে উঠাইয়া কাতর স্বরে হে প্রভু। হে প্রভু !! বলিয়া ডাকিতেছে। কিন্তু তাহার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম। (অর্থাৎ, সবই হারাম উপায়ে উপার্জিত) এবং সেই হারামই সে খাইয়া থাকে। এই ব্যক্তির দোআ কিরূপে গৃহীত হইতে পারে। মুসলিম হাদীস নং: ২৭৬০ .
হালাল উপার্জনের গুরুত্ব.
ইসলামে হালাল রিজিক বা বৈধ উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল এবং হারাম পার্থক্য করে দিয়েছেন। রিজিক তথা জীবনযাপনের উপকরণে হালাল এবং পবিত্র উপায় অবলম্বনের গুরুত্ব দিয়ে ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে। হালাল রিজিক গ্রহণ এবং হারাম থেকে বিরত থাকা ইসলামের মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর নির্দেশ পালন: কুরআন এবং হাদিসে বহুবার হালাল রিজিকের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নিজে আমাদের জন্য হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন শুধু হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবনযাপন করতে।
কুরআনে বলা হয়েছে,
হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”
— সূরা আল-বাকারা (২:১৬৮)
মানুষকে মহান আল্লাহ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাদের যাবতিয় মৌলিক অধিকারও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে লক্ষে তিনি মহাশুণ্যের সব সৃষ্টিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:তিনি (আল্লাহ) সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা আছে, সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি মনোযোগ দিয়েছেন আকাশের দিকে, অতঃপর তা সাত আকাশরূপে সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৯)
আল্লাহ তা‘আলা ফরয ইবাদত সমাপনান্তে জীবিকা নির্বাহে উপার্জন করার লক্ষ্যে যমিনে ছড়িয়ে পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:অতঃপর নামায শেষ হয়ে গেলে তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, ৭ এবং আল্লাহকে স্মরণ কর বেশি বেশি যাতে তোমরা সফলকাম হও ।
(সূরা আল-জুম’আহ: ১০)
হান্নাদ ইবনু আস্ সারী (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ “কোন ব্যক্তি সকালে উঠে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে তা নিজের পিঠে বহন করে এনে অপরকে দান করে এবং এ দিয়ে অপরের দ্বারস্থ হওয়া থেকে মুক্ত থাকে। তার এ কাজ মানুষের দরজায় দরজায় বেড়ানোর চেয়ে উত্তম- তারা কিছু দিক বা না দিক। কেননা উপরের হাত নীচের হাতের চেয়ে উত্তম। যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তোমার উপর ন্যস্ত তাদের দিয়েই দান শুরু কর।” হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ২২৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৪২(ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২২৬৮, ইসলামীক সেন্টার ২২৬৯)
হারাম.
ইসলামে যে কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তাকে হারাম বলে। অর্থাৎ কুরআনুল কারিম ও বিশ্বনবির হাদিসে যে সব কাজ ও বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বা অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় তা হারাম বা অবৈধ। অন্য কথায়- হারাম উপায়ে উপার্জিত অর্থ অবৈধ, ক্ষতিকারক, অকল্যাণকর কাজসমূহ; যা মানুষের জন্য অপকারের বা ক্ষতির কারণ। ঐ সব কাজ ও বিষয়সমূহকে আল্লাহ তাআলা হারাম ঘোষণা করেছেন।
হারামের বিধান প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন- সে সব লোক; যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রাসুলের; যিনি উম্মী নবি; যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়; তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম (হারাম) থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ এবং তাদের ওপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দীত্ব অপসারণ করেন; যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল। সুতরাং যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।’ (সুরা আ’রাফ : আয়াত ১৫৭)
আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য শুকর খাওয়াকে হারাম করেছেন। কিন্ত কেউ যদি শুকরকে সুন্নত নিয়মে জবেহ করে তবুও তা হালাল হবে না বরং হারাম হবে। কারণ এখানে আল্লাহ তাআলার হুকুম নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তরীকায় জাবেহ করলেও তা বৈধ বা হালাল হবে না এবং ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।এভাবে আল্লাহ তাআলা যে সব কাজ বা বস্ত হারাম করেছেন। হারাম কাজ করলে আল্লাহর শাস্তি নির্ধারিত বিধায় এ ধরনের কাজ বর্জন করাও বাধ্যতামূলক। যেমন- সুদ , ঘুস, বেপর্দা, হারাম ব্যবসা ইত্যাদি সব কিছুই মুসলমানের জন্য হারাম হবে। এ গুলো ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন কুরআনে.
নিশ্চয় তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত এবং যা গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা হয়েছে। সুতরাং যে বাধ্য হবে, অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে, তাহলে তার কোন পাপ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা আল-বাকারা – আয়াত ১৭৩
.
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন
হে মু’মিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর, এ সব গর্হিত বিষয়, শাইতানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাক, যেন তোমাদের কল্যাণ হয়। (সূরা আল-মায়িদাহ 5:90)
ইসলামে হারাম সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সহীহ হাদীস (নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী) তুলে ধরা হলো, যেগুলো হালাল-হারাম বোঝার জন্য অপরিহার্য:
নু‘মান ইব্নু বশীর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, ‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু’য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয় হতে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহ্ সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহ্রই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল ক্বলব (অন্তর)। সহিহ বুখারী : ৫২
(২০৫১; মুসলিম ২২/২০ হাঃ ১৫৯৯, আহমাদ ১৮৩৯৬, ১৮৪০২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫০,ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৫০)
আবু হুজায়ফা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিষেধ করেছেন, রক্ত বিক্রয় মূল্য হতে, কুকুর বিক্রয়ের মূল্য হতে, ব্যভিচার বা যেনার বিনিময় হতে এবং তিনি লা’নত করেছেন সুদ গ্রহীতার প্রতি ও সুদদাতার প্রতি। তিনি আরও লা’নত করেছেন ঐ ব্যক্তির প্রতি যে দেহের কোন অংশ (নাম বা চিত্র ইত্যাদি) উলকী করে এবং যে উলকী করায়। এতদ্ভিন্ন ছবি অংকনকারীর প্রতিও লা’নত করেছেন (বুখারী, মিশকাত হা/২৭৬৫)।
হারাম জিনিস ক্ষতিকর.
আল্লাহতায়ালা আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তিনি বান্দাদের প্রতি অপরিসীম দয়াবান। এ কারণে তিনি মানুষের জন্য অযৌক্তিক কিংবা বিবেক-বুদ্ধি পরিপন্থী কোনো বিধান দেননি। তিনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে এক একটা জিনিসকে হালাল বা হারাম ঘোষণা করেছেন। এর কারণ- সার্বিকভাবে সমগ্র মানবতার মৌলিক কল্যাণ সাধন।
আর এ বিষয়টিকে সামনে রেখে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্যে কেবল পাক-পবিত্র, উত্তম-উৎকৃষ্ট জিনিস হালাল করেছেন এবং হারাম করেছেন যাবতীয় নিকৃষ্ট-নষ্ট-খারাপ-ক্ষতিকর দ্রব্যাদি।
বস্তুত যা খুব বেশি ও সম্পূর্ণ ক্ষতিকর তার উপকারের তুলনায় তাকেই হারাম ঘোষণা করেছে ইসলাম।
প্রসঙ্গত বলা যায়, তিনি ইয়াহূদীদের প্রতি কিছু কিছু ভাল ও উৎকৃষ্ট জিনিসও হারাম করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা ছিল স্বয়ং ইয়াহূদীদের নাফরমানীসূচক আচরণের শাস্তিস্বরূপ। কেননা ওরা আল্লাহ্র হালাল হারামের সীমাকে স্বেচ্ছাচারিতা করে লংঘন করেছিল। আল্লাহ্ সেই কথাই বলেছেন নিম্নোক্ত আয়াতেঃ
আমি ইয়াহুদীদের জন্য নখরবিশিষ্ট সকল জন্তু হারাম করেছিলাম এবং গরু ও ছাগল থেকে তাদের জন্য হারাম করেছিলাম তাদের চর্বি, তবে যে চর্বি তাদের পিঠ বা অন্ত্রে লেগে থাকে বা যা কোন অস্থিতে থাকে (তা ব্যতিক্রম ছিল)। এই শাস্তি আমি তাদেরকে দিয়েছিলাম তাদের অবাধ্যতার কারণে। নিশ্চয়ই আমি সত্যবাদী। (সূরা আন’আমঃ ১৪৬)
যারা ইয়াহূদী মত গ্রহণ করে জুলুম করেছে, এ জুলুমের কারণে আমরা তাদের প্রতি সে সব জিনিসই হারাম করে দিয়েছি, যা তাদের জন্যে হালাল করে দেয়া হয়েছিল। সে সঙ্গে তাদের এ অপরাধের কারণেও যে, তারা লোকদেরকে খুব বেশি বাধা দিত, তারা সুদ গ্রহণ করত অথচ তা থেকে তাদের নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল, আর তারা অবৈধ উপায়ে লোকদের ধন-মাল ভক্ষণ করত। এবং আমি তাদের মাঝে যারা অবিশ্বাসী তাদের জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা আ্ন্ নিসাঃ ১৬০–১৬১)
অতঃপর অপরাধের কাফ্ফারা স্বরূপ ভাল, পবিত্র, উত্তম দ্রব্যাদি হারাম করার পরিবর্তে ইসলামে অন্যান্য পন্থা ও উপায়ের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। গুনাহের কাফ্ফারার জন্যে খালেস তওবার ব্যবস্থা করা হয়। পানি যেমন করে ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়, তওবাও ঠিক তেমনি গুনাহ্ মাফ করিয়ে দেয়। এ ছাড়া এমন অনেক কাজেরও বিধান দেয়া হয়েছে, যা খারাপ কাজকে নির্মূল করে দেয়। দান-সাদকা ও গুনাহের আগুন নির্বাপিত করে, যেমন করে পানি নিভিয়ে দেয় আগুন। এছাড়া চলমান জীবনে এমন অনেক দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসীবত ভোগ করতে হয় যা বান্দার গুণাহ-খাতা ও ভুল-ভ্রান্তি শুষ্ক পত্র-পল্লবের মতই ঝরিয়ে দেয়। এ কারণে ইসলামের এ সত্য অকাট্য হয়ে দেখা দিয়েছে যে, তা যা কিছু হারাম করেছে, তা অবশ্যই খারাপ, নিকৃষ্ট ও ক্ষতিকর।
বস্তুত যা খুব বেশি ও সম্পূর্ণ ক্ষতিকর তার উপকারের তুলনায় তাকেই হারাম করে দিয়েছে। যার যা খালেসভাবে উপকারী ও কল্যাণকর তাকে হালাল করে দেয়া হয়েছে।
মদ্য ও জুয়া প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের এ কথাই বলা হয়েছেঃ তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও, নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে তাই খরচ করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্দেশ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা করতে পার। (সূরা বাকারাঃ ২১৯)
সাধারণত লোভ-লালসা মানুষকে হারাম উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করে। লোভী মানুষ তার স্বার্থের জন্য সব করতে পারে।
সামান্য কিছু সম্পদের লোভে তারা হালাল-হারামের তোয়াক্কা পর্যন্ত করে না। ফলে মহান আল্লাহ তাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান, যা প্রতিটি মাখলুকের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয়।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য খরিদ করে, আখিরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না কেয়ামতের দিন।আর তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭৭)
হারাম উপার্জনের যত শাস্তি.
মুহাম্মাদ ইবনু সাববাহ, যুহায়র ইবনু হারব ও উসমান ইবনু আবূ শাইবা (রহঃ) ….. জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন সুদখোরের উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দু’জনের উপর এবং বলেছেন এরা সবাই সমান। হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৯৮৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৫৯৮ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৯৪৮, ইসলামিক সেন্টার ৩৯৪৭)
মহান আল্লাহ বলেন. আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদাকাকে বর্ধিত করেন। আর আল্লাহ এমন প্রতিটি লোককে অপছন্দ করেন যে নাশোকর, পাপিষ্ঠ। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৬)
তাফসীরকারগণ বলেনঃ সুদকে মেটানো এবং দান-সদকাকে বাড়ানো আখেরাতে তো হবেই, কিন্তু এর কিছু কিছু লক্ষণ দুনিয়াতেও প্রত্যক্ষ করা যায়। যে সম্পদের সাথে সুদ মিশ্রিত হয়ে যায়, অধিকাংশ সময় সেগুলো তো ধ্বংস হয়ই, অধিকন্তু আগে যা ছিল, তাও সাথে নিয়ে যায়। সুদ ও জুয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই এরূপ ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা যায়। অজস্র পুঁজির মালিক কোটিপতি দেখতে দেখতে দেউলিয়া ও ফকীরে পরিণত হয়। মোটকথা, এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেনঃ আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং দান-সদকাকে বর্ধিত করেন। এ উক্তি আখেরাতের দিক দিয়ে তো সম্পূর্ণ পরিস্কার; সত্য উপলব্ধির সামান্য চেষ্টা করলে দুনিয়ার দিক দিয়েও সুস্পষ্ট। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তিঃ “সুদ যদিও বৃদ্ধি পায় কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা”। [মুসনাদে আহমাদঃ ১/৩৯৫] এর উদ্দেশ্যও তাই।
হারাম উপার্জন মানুষকে যেভাবে দুনিয়ায় শাস্তি দেয়, তেমনি কবরেও তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, আজ রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, দুই ব্যক্তি আমার কাছে এসে আমাকে এক পবিত্র ভূমিতে নিয়ে গেল। আমরা চলতে চলতে এক রক্তের নদীর কাছে পৌঁছলাম। নদীর মধ্যস্থলে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে এবং আরেক ব্যক্তি নদীর তীরে, তার সামনে পাথর পড়ে রয়েছে। নদীর মাঝখানের লোকটি যখন বের হয়ে আসতে চায় তখন তীরের লোকটি তার মুখে পাথর খণ্ড নিক্ষেপ করে তাকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এভাবে যতবার সে বেরিয়ে আসতে চায় ততবারই তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করছে আর সে স্বস্থানে ফিরে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ ব্যক্তি কে? সে বলল, যাকে আপনি (রক্তের) নদীতে দেখেছেন, সে হলো সুদখোর। (বুখারি, হাদিস : ২০৮৫) (৪৪৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৪০ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৯৫৫)
হারাম পথে উপার্জন করে সেখান থেকে কিছু সদকা করে দিলে হয়তো শাস্তি কিছুটা হালকা হবে। অথবা আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু ব্যাপারটা এ রকম নয়।
উসামা ইব্ন উমায়র (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্রতা ব্যতীত কোন সালাত কবুল করেন না এবং অবৈধভাবে অর্জিত মালের সদকা গ্রহণ করেন না। সুনানে আন-নাসায়ী : ১৩৯
অতএব, আমাদের সবার উচিত, হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকা। কারণ এর দ্বারা সাময়িক সচ্ছলতা অর্জন হলেও এর ক্ষতি চিরস্থায়ী।
হারাম থেকে বাঁচার উপায় .
দুনিয়ার মানুষের প্রতি আল্লাহর বড় রহমত হচ্ছে এই যে, তিনি হালাল যেমন স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, তেমনি হারামকেও চিহ্নিত করে দিয়েছেন।
তোমাদের জন্য এমন কী বাধা আছে, যদ্দরুন তোমরা যে সকল পশুতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে তা থেকে খাও না? অথচ তিনি তোমাদের জন্য (সাধারণ অবস্থায়) যা-কিছু হারাম করেছেন তা তিনি তোমাদেরকে বিশদভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তবে তোমরা যা খেতে বাধ্য হয়ে যাও (তার কথা ভিন্ন। হারাম হওয়া সত্ত্বেও তখন তা খাওয়ার অনুমতি থাকে)। বহু লোক কোনও রকমের জ্ঞান ছাড়া (কেবল) নিজেদের খেয়াল-খুশীর ভিত্তিতে (অন্যদেরকে) বিপথগামী করে। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সীমালংঘনকারীদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। (আল আন’আমঃ ১১৯)
আতিয়্যা সা‘দী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কোন বান্দা ক্ষতিকর কাজে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে বৈধ অক্ষতিকর বিষয় না ছেড়ে দেয়া পর্যন্ত মুত্তাকীদের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারবে না। জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৫১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২১৫
হাদীসটির উদ্দেশ্য হল- খাঁটি মুত্তাকী হতে হলে সব ধরনের হারাম ও গোনাহের বিষয় থেকে বাঁচতে হবে। আর গোনাহ ও হারাম থেকে বাঁচতে হলে হারাম নয়, কিন্তু হারামের সন্দেহ হয় কিংবা তা করলে হারামে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; তেমনি গোনাহ নয়, কিন্তু গোনাহের সন্দেহ হয় কিংবা তা করলে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে- এমন সবকিছুও পরিহার করতে হবে।
নু‘মান ইব্নু বশীর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, ‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু’য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয় হতে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহ্ সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহ্রই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল ক্বলব (অন্তর)।সহিহ বুখারী : ৫২(২০৫১; মুসলিম ২২/২০ হাঃ ১৫৯৯, আহমাদ ১৮৩৯৬, ১৮৪০২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫০,ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৫০)
হাদীসটিতে যে বিষয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এরই নাম ওয়ারা‘। অর্থাৎ তুমি যদি সুস্পষ্ট হারাম ও সুস্পষ্ট গোনাহ পরিহার করতে চাও, তাহলে যেসব বিষয়ে হারামে লিপ্ত হওয়ার বা গোনাহ হওয়ার সন্দেহ হয় সেসবও বর্জন করে চল। তখন তোমার মধ্যে গোনাহ ও হারাম থেকে বাঁচার অভ্যাস হয়ে যাবে। ফলে তুমি সহজেই হারাম ও গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ এমন কে আছে যে আমার নিকট হতে এ কথাগুলো গ্রহণ করবে এবং সে মুতাবিক নিজেও আমল করবে অথবা এমন কাউকে শিক্ষা দিবে যে অনুরূপ আমল করবে? আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি আছি। অত:পর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং গুনে গুনে এ পাঁচটি কথা বললেনঃ তুমি হারাম সমূহ হতে বিরত থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় আবিদ বলে গণ্য হবে; তোমার ভাগ্যে আল্লাহ্ তা’আলা যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তাতে খুশি থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা স্বনির্ভর বলে গণ্য হবে; প্রতিবেশীর সাথে ভদ্র আচরণ করলে প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে; যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা-ই অন্যের জন্যও পছন্দ করতে পারলে প্রকৃত মুসলমান হতে পারবে এবং অধিক হাসা থেকে বিরত থাক। কেননা অতিরিক্ত হাস্য-কৌতুক হৃদয়কে মৃতবৎ করে দেয়। জামে’ আত-তিরমিজি : ২৩০৫-হাসান, সহিহাহ (৯৩০), তাখরিজুল মুশকিলাহ (১৭)