
প্রিয় পাঠক, একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ার স্বপ্ন আমাদের সবার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আদর্শ সমাজের ভিত্তি কী হবে? আমরা যখন পবিত্র কোরআনের সূরা ইসরা গভীরভাবে অধ্যয়ন করি, তখন দেখতে পাই আল্লাহ তাআলা এখানে কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির কথা বলেননি, বরং একটি মজবুত সামাজিক কাঠামো গঠনের স্পষ্ট নীতিমালাও দিয়েছেন। মিরাজের সেই অলৌকিক ভ্রমণের প্রেক্ষাপটে নাযিল হওয়া এই সূরাটি আমাদের শেখায় যে ব্যক্তিগত পবিত্রতা আর সামাজিক দায়বদ্ধতা একে অপরের পরিপূরক। বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার থেকে শুরু করে অপচয় বর্জন, মাপে ঠিক দেওয়া এবং চারিত্রিক শুদ্ধি এসবই হলো একটি আদর্শ সমাজের প্রাণশক্তি। সূরা ইসরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য কেবল তসবিহ পাঠে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের অধিকার রক্ষা এবং নৈতিকতা বজায় রাখার মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত সফলতা।
মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও মিরাজ
মিরাজ কেবল একটি অলৌকিক সফর নয়, বরং এটি আমাদের ঈমান ও তাওহীদকে চেনার এক মহিমান্বিত সুযোগ। এই সত্য জাগতিক যুক্তির ঊর্ধ্বে হলেও হৃদয়ের বিশ্বাস দিয়ে গ্রহণ করতে হয়। প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে আল্লাহর কুদরতের ওপর কোনো প্রকার সংশয় ছাড়াই পূর্ণ আস্থা রাখে। আমরা দুনিয়ার যে নিয়ম বা বিজ্ঞানের ওপর ভরসা করি, তার সবটুকুই আল্লাহর ইশারায় চলে। রাসূল (সা.)-কে মুহূর্তের মধ্যে আরশে আজিমে নিয়ে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে সৃষ্টির কোনো সীমাবদ্ধতা স্রষ্টাকে আটকাতে পারে না। আমরা সময় ও স্থানের ফ্রেমে বন্দি থাকলেও আল্লাহ এর ঊর্ধ্বে। এই আত্মসমর্পণই আমাদের ঈমানের মূল ভিত্তি। দুনিয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর রহমতের পথ সব সময় খোলা থাকে। এই সফরের শ্রেষ্ঠ উপহার ‘নামাজ’, যার মাধ্যমে মুমিন প্রতিদিন আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। তাই নামাজকে বলা হয় ‘মুমিনের মিরাজ’।
আল্লাহর আনুগত্য মানে কেবল বাহ্যিক আমল নয়, বরং অন্তর থেকে তাঁকে একমাত্র অভিভাবক হিসেবে স্বীকার করা। জীবনের কঠিন সময়ে মিরাজের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যিনি তাঁর রাসূলকে মহাকাশের ঊর্ধ্বে নিতে পারেন, তিনি আপনার জীবনের পরীক্ষাগুলোও সহজ করে দিতে সক্ষম। কুরআনের ভাষা অনুযায়ী-
“তাঁর কাজকর্ম কেবল এ রকম যে, যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছে করেন তখন তাকে হুকুম করেন যে হয়ে যাও, আর অমনি তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসিন: ৮২)
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, ইসলামে মা-বাবার মর্যাদা কতটা উপরে? সূরা ইসরা (বনী ইসরাঈল) পড়লে আমরা দেখি, মহান আল্লাহ নিজের ইবাদত করার নির্দেশের ঠিক পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন। এর মানে হলো, স্রষ্টার হুকুম পালনের পরেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো মা-বাবার সেবা করা। এটি কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং এটিই হলো মানবিকতার সর্বোচ্চ পরিচয়।
বিশেষ করে তাঁরা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, আল্লাহ তাআলা তা স্পষ্টভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, তাঁদের সাথে ‘উফ’ শব্দটি পর্যন্ত করো না। একটু চিন্তা করে দেখুন, আমাদের অবহেলা বা বিরক্তির ক্ষুদ্রতম প্রকাশকেও যেখানে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে তাঁদের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলা বা তাঁদের মনে কষ্ট দেওয়া কতটা বড় অপরাধ!
ইসলাম আমাদের শেখায়, তাঁদের সামনে সম্মানের ডানা বিছিয়ে দিতে এবং সবসময় তাঁদের জন্য মনেপ্রাণে দোয়া করতে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তাঁরা যেমন মমতা দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছেন, আজ তাঁদের বার্ধক্যে সেই একই মমতা ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। প্রকৃতপক্ষে, স্রষ্টাকে খুশি করার সবচেয়ে সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ হলো নিজের মা-বাবার সেবা করা। আমাদের মনে রাখা উচিত, মানবতার সেবা যদি নিজের ঘর থেকে শুরু না হয়, তবে বাইরের জগতের সমাজসেবা একেবারেই অর্থহীন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
“তোমার প্রতিপালক হুকুম জারি করেছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো ‘ইবাদাত করো না, আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা তাদের উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে বিরক্তি বা অবজ্ঞাসূচক কথা বলো না, আর তাদেরকে ভৎর্সনা করো না। তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও আর বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন পালন করেছেন।” (: সূরা ইসরা:২৩–২৪)
সামাজিক সাম্য ও আত্মীয়-স্বজনের হক
একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং পারস্পরিক অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সূরা ইসরায় আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন এবং মুসাফিরদের তাদের প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিই। ইসলামে দান-সদকা কেবল দয়া নয়, বরং এটি ধনীদের সম্পদে অভাবীদের একটি ‘অধিকার’। যখন আমরা আমাদের উপার্জনের একটি অংশ অভাবী আত্মীয় বা পাড়া-প্রতিবেশীকে দিই, তখন সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসে এবং মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি হয়। এটিই হলো সামাজিক সাম্যের মূল ভিত্তি। যেখানে কেউ অঢেল সম্পদের পাহাড়ে চড়বে না, আবার কেউ ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমাবে না।
অন্যদিকে, একটি আদর্শ সমাজের অন্যতম বাধা হলো অভাবের ভয় এবং অনিশ্চয়তা। ইসলাম আমাদের সেই অন্ধকার যুগ থেকে বের করে এনেছে যেখানে মানুষ দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রতিটি প্রাণের রিজিকের দায়িত্ব তাঁর। রিজিকের এই নিশ্চয়তা আমাদের শেখায় যে, মানুষ কেবল অর্থনৈতিক কারণে কোনো অনৈতিক কাজ বা নিষ্ঠুরতায় জড়িয়ে পড়তে পারে না। যখন আমরা বিশ্বাস করি যে আল্লাহই শ্রেষ্ঠ দাতা, তখন মানুষের প্রতি দয়া করা এবং অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। মূলত আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় এবং অভাবীদের অধিকার রক্ষার মাধ্যমেই একটি শান্তিময় ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
“আর আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরদেরকেও, আর অপব্যয়ে অপচয় করো না।” (সূরা আল-ইসরা: ২৬)
“দরিদ্রতার ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিযক দেই আর তোমাদেরকেও, তাদের হত্যা মহাপাপ।“(সূরা ইসরা:৩১)
অপচয় রোধ ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা
বর্তমানে আমাদের সমাজে ‘অপচয়’ যেন এক ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে মিতব্যয়িতা। আপনি কি জানেন, সূরা ইসরায় আল্লাহ তায়ালা অপচয়কারীকে সরাসরি ‘শয়তানের ভাই’ বলে কেন আখ্যায়িত করেছেন? কারণ শয়তান যেমন আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞ, একজন অপচয়কারীও ঠিক তেমনি আল্লাহর দেওয়া সম্পদের কদর না করে তা অকারণে নষ্ট করে। আমাদের একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা দরকার মিতব্যয়িতা মানে কৃপণতা নয়, বরং এটি হলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ না করা এবং সঠিক জায়গায় সম্পদ ব্যয় করার নাম।
আজ আমরা যখন কোনো দাওয়াতে গিয়ে প্লেটের অর্ধেক খাবার অবলীলায় ফেলে দিই, কিংবা কেবল ‘স্ট্যাটাস’ দেখানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় দামী জিনিস কিনি তখন আমরা আসলে একজন অভাবী মানুষের অধিকার নষ্ট করি। অথচ আল্লাহ তায়ালা আমাদের সম্পদের মধ্যেই গরিব-দুঃখীদের হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা যাকাত ও সদকার মাধ্যমে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা মানেই হলো আপনার উপার্জনের প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখা। মিতব্যয়ী হলে আপনার হাতে এমন কিছু বাড়তি অর্থ থাকবে যা দিয়ে আপনি কোনো অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন। অপচয় নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) কতটা কঠোর ছিলেন, তা একটি হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি যখন সা’দ (রাঃ)-কে ওজু করতে দেখলেন, তখন তাকে অতিরিক্ত পানি ব্যবহারে নিষেধ করে বললেন,“এই অপচয় কেন? যদিও তুমি প্রবহমান নদীতে থাকো (তবুও অপচয় করো না)।” (সুনান ইবনে মাজাহ: ৪২৫)।
আল্লাহর রাসূল (সা.) অকারণে সম্পদ নষ্ট করাকে কতটা অপছন্দ করতেন, তা মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রাঃ) বর্ণিত এই হাদীসটি পড়লে বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন: অনর্থক কথাবার্তা, সম্পদ নষ্ট করা এবং অত্যধিক সওয়াল (যাঞ্চা) করা।” (সহিহ বুখারি: ১৪৭৭)।
আমাদের সমাজ থেকে যদি এই অপচয় আর বিলাসিতা দূর করা যেত, তবে অভাবী মানুষের সংখ্যা এমনিতেই কমে আসত। তাই শয়তানের দেখানো পথে পা না দিয়ে, আমাদের উচিত আল্লাহর প্রতিটি নেয়ামতের কদর করা। মনে রাখবেন, অপচয় আপনার সম্পদকে কমায় এবং অন্তরকে কঠোর করে তোলে; আর মিতব্যয়িতা আপনার জীবনে ও সম্পদে অকল্পনীয় বরকত নিয়ে আসে।
এতিমের অধিকার রক্ষা ও ইনসাফপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ
একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা চেনা যায় সেই সমাজের দুর্বল মানুষগুলো কতটা নিরাপদ তার ওপর ভিত্তি করে। ইসলামে এতিমের সম্পদ রক্ষা করাকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, মহান আল্লাহ এতিমের সম্পদের কাছে যেতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাবলম্বী হচ্ছে। শুধু সম্পদ রক্ষা নয়, বরং তাদের শিক্ষা সহায়তা নিশ্চিত করাও ইসলামের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যাতে তারা জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
এতিম মানে যার মাথার ওপর কোনো ছায়া নেই; আর তার সম্পদ আত্মসাৎ করা মানে কেবল অপরাধ নয়, বরং নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরা। আমরা যখন কোনো এতিম শিশুর অধিকার রক্ষা করি এবং তার শিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা করি, তখন আসলে আমরা সমাজের ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারকে সমুন্নত রাখি। আমাদের মনে রাখা জরুরি এতিমদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কেবল নিছক দয়া নয়, বরং এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার।
সমাজের এই ন্যায়বিচারের দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো আমাদের ‘বাজার ব্যবস্থা’। ব্যবসায়িক লেনদেনে সঠিক মাপ বা ওজন দেওয়া কেবল একজন ব্যবসায়ীর নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আল্লাহর সরাসরি আদেশ। সূরা ইসরায় আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন যে, যখন মেপে দেবে, তখন পূর্ণ মাপে দেবে এবং সঠিক ওজনে দেবে। আমরা অনেক সময় মাপে সামান্য কারচুপি করে ভাবি যে অনেক লাভ করে ফেলেছি! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই ক্ষণস্থায়ী লাভের আড়ালে আমরা আমাদের আখিরাত ও ব্যবসার বরকত দুটোই হারিয়ে ফেলি।
ইনসাফপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা ছাড়া একটি সমাজ কখনো সুখী হতে পারে না। আপনি যখন পাল্লায় সঠিক ওজন দেন, তখন আপনি কেবল একজন সৎ ব্যবসায়ীই নন, বরং আপনি সমাজের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাসের সেতুবন্ধন তৈরি করেন। আর এই ‘বিশ্বাসই’ হলো একটি আদর্শ সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি, যেখানে এতিমের অধিকার, শিক্ষা সহায়তা এবং ন্যায়ভিত্তিক লেনদেন একসাথে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
“ইয়াতীম বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তার সম্পদের কাছেও যেয়ো না সৎ উদ্দেশ্য ব্যতীত। আর ওয়া‘দা পূর্ণ কর, ওয়া‘দা সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরা আল-ইসরা:৩৪)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত-
তিনি বলেন, “সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে।” সাহাবীগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী?” তিনি বললেন, “(১) আল্লাহ্র সাঙ্গে শরীক করা (২) যাদু (৩) আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত কারন ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মু’মিনাদের অপবাদ দেয়া।” (সহিহ বুখারী: ২৭৬৬)
একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা চেনা যায় সেই সমাজের দুর্বল মানুষগুলো কতটা নিরাপদ, তার ওপর ভিত্তি করে। ইসলামে এতিমের সম্পদ রক্ষা করাকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, মহান আল্লাহ এতিমের সম্পদের কাছে যেতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাবলম্বী হচ্ছে।
এতিম মানে যার মাথার ওপর কোনো ছায়া নেই; আর তার সম্পদ আত্মসাৎ করা মানে কেবল অপরাধ নয়, বরং নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরা। সূরা ইসরায় আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন “ইয়াতীম বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তার সম্পদের কাছেও যেয়ো না সৎ উদ্দেশ্য ব্যতীত।” (সূরা ইসরা: ৩৪)। রাসূলুল্লাহ (সা.) এতিমের মাল আত্মসাৎ করাকে যে কতটা ভয়াবহ পাপ হিসেবে দেখতেন, তা বোঝা যায় তাঁর একটি হাদীস থেকে। তিনি সাতটি ধ্বংসকারী কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন,“(১) আল্লাহ্র সাঙ্গে শরীক করা (২) যাদু (৩) আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত কারন ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মু’মিনাদের অপবাদ দেয়া।” (সহিহ বুখারি: ২৭৬৬)। আমরা যখন কোনো এতিম শিশুর অধিকার রক্ষা করি, তখন আসলে আমরা সমাজের ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারকেই সমুন্নত রাখি।
সমাজের এই ন্যায়বিচারের দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো আমাদের ‘বাজার ব্যবস্থা’। ব্যবসায়িক লেনদেনে সঠিক মাপ বা ওজন দেওয়া কেবল একজন ব্যবসায়ীর নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আল্লাহর সরাসরি আদেশ। সূরা ইসরায় আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন যে, “মাপ দেয়ার সময় মাপ পূর্ণমাত্রায় করবে, আর ওজন করবে ত্রুটিহীন দাঁড়িপাল্লায়। এটাই উত্তম নীতি আর পরিণামেও তা উৎকৃষ্ট।” (সূরা ইসরা:৩৫)। আমরা অনেক সময় মাপে সামান্য কারচুপি করে ভাবি যে অনেক লাভ করে ফেলেছি! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই ক্ষণস্থায়ী লাভের আড়ালে আমরা আমাদের আখিরাত ও ব্যবসার বরকত দুটোই হারিয়ে ফেলি।
ইনসাফপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা ছাড়া একটি সমাজ কখনো সুখী হতে পারে না। আপনি যখন পাল্লায় সঠিক ওজন দেন, তখন আপনি কেবল একজন সৎ ব্যবসায়ীই নন, বরং আপনি সমাজের মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাসের সেতুবন্ধন তৈরি করেন। আর এই ‘বিশ্বাসই’ হলো একটি আদর্শ সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি।
চারিত্রিক পবিত্রতা ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণে ইসলামের দণ্ডবিধি
একটি সমাজ তখনই বসবাসের যোগ্য হয়ে ওঠে যখন সেখানে মানুষের জীবন এবং সম্মান দুটোই নিরাপদ থাকে। ইসলাম কেবল কিছু বিধি-নিষেধের নাম নয়, বরং এটি একটি নিরাপদ ও সুন্দর সমাজ গড়ার পূর্ণাঙ্গ বিধান। সূরা ইসরায় আল্লাহ তাআলা চারিত্রিক পবিত্রতা এবং জীবনের নিরাপত্তার ওপর যে জোর দিয়েছেন, তা আধুনিক সমাজের অস্থিরতা দূর করার একমাত্র পথ।
ব্যভিচার ও পারিবারিক সুরক্ষা: প্রথমেই আসি চারিত্রিক পবিত্রতার বিষয়ে। আল্লাহ তায়ালা কিন্তু বলেননি যে ‘ব্যভিচার করো না’, বরং তিনি বলেছেন “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।” কেন এই সতর্কতা? কারণ ব্যভিচার বা অবৈধ সম্পর্ক কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়, এটি একটি গোটা পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। এটি সমাজে অশান্তি, অবিশ্বাস এবং হাজারো জটিলতার জন্ম দেয়। ইসলাম চারিত্রিক পবিত্রতাকে যে গুরুত্ব দেয়, তার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবার রক্ষা করা। যখন পরিবারের পবিত্রতা বজায় থাকে, তখন সেই সমাজে বেড়ে ওঠা সন্তানরাও সুন্দর মানসিকতা নিয়ে বড় হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
“কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫)।
অর্থাৎ, এই পাপ মানুষের ঈমানি চেতনাকে গ্রাস করে ফেলে। ইসলাম চারিত্রিক শুদ্ধিকে যে গুরুত্ব দেয়, তার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবার রক্ষা করা। যখন পরিবারের পবিত্রতা বজায় থাকে, তখন সেই সমাজে বেড়ে ওঠা সন্তানরাও সুন্দর মানসিকতা নিয়ে বড় হয়।
জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার: সমাজের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো মানুষের জীবনের অধিকার। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, “অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণ হত্যা করা মানে হলো পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করা।” (সূরা মায়েদা:৩২)। সমাজ থেকে অপরাধ কমানোর জন্য ইসলাম যে বিধান দিয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে কেউ অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়ার সাহস না পায়।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট পৃথিবী ধ্বংস হওয়াটা অধিকতর সহজ ব্যাপার একজন মুসলিম খুন হওয়ার পরিবর্তে।” (সুনান তিরমিজি: ১৩৯৫)
আমরা যখন আল্লাহর দেওয়া এই সীমানাগুলো মেনে চলব, তখন আমাদের সমাজে কোনো মা-বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না, কোনো মানুষকে অকালে প্রাণ দিতে হবে না। চারিত্রিক শুদ্ধি আমাদের ভেতরটাকে সুন্দর করে, আর ইসলামের শাসন ও আইন আমাদের চারপাশটাকে নিরাপদ রাখে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে এমন এক আদর্শ সমাজ, যেখানে প্রতিটি মানুষ মাথা উঁচু করে এবং শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারে।
প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব
আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক লেনদেন সবকিছুর মূল ভিত্তি হলো ‘ওয়াদা’ বা প্রতিশ্রুতি। সূরা ইসরায় আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, “তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তোমাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে।” (সূরা ইসরা: ৩৪)। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা যখন কাউকে কথা দিই, সেটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং একটি পবিত্র আমানত। আজকের এই যুগে, বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টকে দেওয়া কথা রাখা এবং সঠিক সময়ে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের ঈমানি দায়িত্বের অংশ। আমরা যখন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করি, তখন কেবল ব্যবসাই সফল হয় না, বরং আমাদের মাধ্যমেই ইসলামের সুন্দর আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মনে রাখবেন, রাসূল (সা.) মুনাফিকের যে তিনটি লক্ষণের কথা বলেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো- অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং আমানতের খিয়ানত করা। (সহিহ বুখারী: ৩৩)
তবে বর্তমান যুগে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- তথ্য যাচাই বা গুজবের মোকাবিলা করা। সূরা ইসরার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন- “আর সে বিষয়ের পেছনে ছুটো না, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই। কান, চোখ আর অন্তর- এগুলোর সকল বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।“ অর্থাৎ, নিশ্চিত না হয়ে কোনো কথা বলা বা ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
আজ আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একটি খবর দেখলেই যাচাই না করে ‘শেয়ার’ করে দিই। এতে অনেক সময় একজনের সম্মান নষ্ট হয় অথবা সমাজে বড় কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বলে বেড়ায়।” (সহিহ মুসলিম: ৫)
মনে রাখবেন, আমাদের কান, চোখ আর মন পরকালে এই সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। আপনি যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোনো কন্টেন্ট শেয়ার করবেন বা লিখবেন, তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন- তথ্যটি কি সত্য? এটি প্রচার করলে কি কারো উপকার হবে? আমাদের এই সামান্য সচেতনতাই পারে সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছ জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা আর সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমেই আমরা একটি আদর্শ এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারি।
বিনয়ী জীবন যাপন ও পরকালীন জবাবদিহিতা
আমাদের চারপাশের চাকচিক্য আর সাময়িক সাফল্য অনেক সময় আমাদের ভেতরে অজান্তেই অহংকার তৈরি করে। কিন্তু সূরা ইসরায় আল্লাহ তাআলা খুব সহজ অথচ শক্তিশালী একটি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “যমীনে গর্বভরে চলাফেরা করো না, তুমি কক্ষনো যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায় পর্বতের ন্যায় হতেও পারবে না।” (সূরা ইসরা:৩৭)। একটু ভেবে দেখুন, আমরা নিজেদের নিয়ে যে বড়াই করি, আমাদের সক্ষমতা আসলে কতটুকু? এই বিনয় কেবল মাটির দিকে তাকিয়ে চলা নয়, বরং এটি হলো অন্তরের একটি বিশেষ অবস্থা যেখানে মানুষ বুঝতে পারে যে তার সবটুকুই আল্লাহর দান। আপনি যখন আপনার কাজে সফল হবেন, তখন এই সফলতা যেন আপনাকে উদ্ধত না করে, বরং কৃতজ্ঞ করে, এটাই হলো প্রকৃত বিনয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন- “কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে বিনীত হলে, আল্লাহ তার মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন।” (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)।
সবচেয়ে বড় চিন্তা আর সতর্কবার্তা হলো আমাদের ‘আমলনামা’। কিয়ামতের দিন যখন সবার বিচার হবে, তখন আল্লাহ আমাদের হাতে আমাদেরই সারা জীবনের কর্মের একটি রেকর্ড বা আমলনামা তুলে দেবেন। সেদিন বলা হবে- “আমি প্রত্যেক লোকের ভাগ্য তার কাঁধেই ঝুলিয়ে রেখেছি (অর্থাৎ তার ভাগ্যের ভাল-মন্দের কারণ তার নিজের মধ্যেই নিহিত আছে) আর ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য আমি এক কিতাব বের করব যাকে সে উন্মুক্ত অবস্থায় পাবে। (তাকে বলা হবে) পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব নেয়ার ব্যাপারে তুমিই যথেষ্ট।“ (সূরা ইসরা:১৩-১৪)। অর্থাৎ, সেদিন আমাদের কোনো উকিলের প্রয়োজন হবে না; আমাদের নিজেদের চোখ, কান আর হাত আমাদের কর্মের সাক্ষী দেবে।
তবে দয়াময় আল্লাহ আমাদের জন্য কত বড় সুযোগ রেখেছেন তা আমরা হাদীসে কুদসী থেকে জানতে পারি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “আল্লাহ ভাল-মন্দ সব লিখে দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি একটি সৎ কাজের ইচ্ছা করে কিন্তু তা করতে না পারে, আল্লাহ তার জন্য পূর্ণ সওয়াব লেখেন। আর যদি কাজটি করে, তবে ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত সওয়াব বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছা করে তা থেকে বিরত থাকলে আল্লাহ পূর্ণ সওয়াব দেন, আর মন্দ কাজটি করে ফেললে মাত্র একটি গুনাহ লেখা হয়।” (সহিহ বুখারি: ৬৪৯১)।
আমরা সারা জীবনে যা যা করেছি হোক তা কোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্ট, অনলাইনে করা মন্তব্য বা শেয়ার, কিংবা পর্দার আড়ালে করা কোনো গোপন কাজ সবই সেদিন ভিডিওর মতো আমাদের সামনে ভেসে উঠবে। তাই এই ডিজিটাল যুগে আমাদের অনলাইন দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই সময়টাই হলো সেই প্রস্তুতির সুযোগ।
আমরা কি এমন কোনো কাজ আমাদের আমলনামায় জমা করছি, যা কিয়ামতের দিন নিজের সামনে পড়তে আমাদের লজ্জা লাগবে না? তাই আসুন, অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হই এবং বাস্তব জীবনের পাশাপাশি অনলাইন জীবনেও আল্লাহর উপস্থিতি ও জবাবদিহিতার অনুভূতি বজায় রাখি। কারণ দিনশেষে আমাদের সেই আমলনামার সামনেই দাঁড়াতে হবে, যেখানে ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ পড়বে না হোক তা অফলাইনে বা অনলাইনে করা কোনো কাজ।
উপসংহার
প্রিয় পাঠক, সূরা ইসরা কেবল নিয়মনীতি নয়, বরং এটি মানবজাতির উত্থান-পতনের এক স্বচ্ছ আয়না। এই সূরায় বনী ইসরাঈলের কাহিনীর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন যে সাফল্য কোনো জাতির স্থায়ী সম্পদ নয়, বরং এটি আল্লাহর আনুগত্য ও ইনসাফ কায়েমের ওপর নির্ভরশীল। যখনই কোনো জাতি অহংকার আর দুর্নীতির পথে পা বাড়িয়েছে, তখনই তাদের ওপর নেমে এসেছে অবমাননাকর পতন। তাই আজকের সামাজিক অস্থিরতা দূর করতে হলে অতীতের এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সঠিক পথে ফিরে আসা জরুরি। কিন্তু এই পথে চলার শক্তি আমরা পাবো কোথায়? ব্যস্ত দিনের ক্লান্তি আর মানসিক অস্থিরতা দূর করার সেরা উপায় হলো ‘তাহাজ্জুদ’। গভীর রাতে যখন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, তখন স্রষ্টার সাথে একান্তে কথা বলাই হলো আত্মার প্রকৃত প্রশান্তির উৎস। যেকোনো কঠিন সময়ে তাহাজ্জুদের জায়নামাজই মুমিনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
পরিশেষে, এতিমের হক রক্ষা, মাপে সঠিক দেওয়া এবং তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করাই হলো ইহকাল ও পরকালে মুক্তির পথ। আসুন, এই শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য না রেখে আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মিশিয়ে নিই। তবেই আমাদের সমাজ হয়ে উঠবে ইনসাফপূর্ণ এবং আমাদের অন্তর খুঁজে পাবে কাঙ্ক্ষিত সেই প্রকৃত প্রশান্তি। আরও পড়ুন