রিজিকের বরকতের জন্য নামাজে সিজদা করে আল্লাহর কাছে দোয়া

মাসের শেষে এসে হিসাব মেলে না। ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে। চাকরিতে বছরের পর বছর পার হলেও উন্নতি নেই। ঘরে বসে ভাবছেন, কী করলে পরিস্থিতি বদলাবে?

আমরা সবাই রিজিক নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা শুধু দুনিয়াবি চেষ্টার দিকে তাকিয়ে থাকি। ওভারটাইম করি, নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা করি, কিন্তু আসল দরজাগুলোর কথা ভুলে যাই। যেই দরজাগুলোর চাবি আল্লাহ নিজেই কুরআন ও হাদিসে দিয়ে রেখেছেন। তাই রিজিক বাড়ানোর ৫টি আমল জানা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। রিজিক শুধু টাকা না। সুস্থতা রিজিক, সন্তান রিজিক,মানসিক শান্তি, শান্তিতে ঘুমাতে পারাও রিজিক। আর এই রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি বলেছেন,“আমিই রিজিকদাতা, শক্তিশালী, অটল।” (সুরা যারিয়াত : ৫৮)

অতএব, যার হাতে রিজিক, তার কাছেই চাইতে হবে। আর তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন কোন পথে গেলে রিজিকে বরকত হয়। আজকে সেই পাঁচটা আমল নিয়ে আলোচনা করবো, যেগুলো কুরআন ও সহিহ হাদিস দিয়ে প্রমাণিত।

ইস্তিগফার বেশি বেশি পড়া

ইস্তিগফার ও জিকিরের মাধ্যমে রিজিকের বরকত কামনার প্রতীক হিসেবে তসবিহ

আমরা ইস্তিগফার পড়ি গুনাহ মাফের জন্য। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে ইস্তিগফারের সাথে রিজিকের সরাসরি সম্পর্ক আছে। আল্লাহ নিজে এই কথা বলেছেন। হজরত নুহ (আ.) তার জাতিকে বলেছিলেন:

“তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী তৈরি করে দেবেন।” (সুরা নুহ : ১০-১২)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ শুধু ক্ষমার কথা বলেননি। বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান, বাগান, নদী, মানে সব ধরনের রিজিকের কথা উল্লেখ করেছেন। সব একসাথে ইস্তিগফারের বিনিময়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগ্‌ফার পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে সর্ব প্রকার বিপদাপদ হতে মুক্ত করবেন, এবং সব রকম দুশ্চিন্তা হতে রক্ষা করবেন এবং তার জন্য এমন স্থান হতে রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারেন না।(আবু দাউদ : ১৫১৮)

একটু চিন্তা করুন । আপনি হয়তো কোনো গুনাহর কারণে রিজিকে বাধা পাচ্ছেন। কিন্তু সেই বাধা কোথা থেকে এসেছে সেটা বুঝতে পারছেন না। ইস্তিগফার সেই লুকানো বাধাও সরিয়ে দেয় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আপনার রিজিকে বরকত দান করেন।

তাকওয়া অবলম্বন করা

এটা হয়তো সবচেয়ে পরিচিত আমল। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এটার গভীরতা বোঝেন না। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত রয়েছে যে,

আর তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য করেছেন একটা সুনির্দিষ্ট মাত্রা।(সুরা তালাক : ০৩)

“যেখান থেকে সে ধারণা করে না।” এই অংশটা মন দিয়ে পড়ুন। এর মানে হলো, তাকওয়াওয়ালা (আল্লাহ ভীরু) মানুষের রিজিক এমন জায়গা থেকে আসে যা সে কখনো চিন্তাও করেনি।

তাকওয়া মানে শুধু নামাজ-রোজা করা না। তাকওয়ার মানে হলো আল্লাহর ভয়কে জীবনের কেন্দ্রে রাখা। এর মানে হলো, ব্যবসায় ঠকানো বন্ধ করা, ওজনে কম না দেওয়া,  সুদের লেনদেন থেকে বের হওয়া, কারো হক মেরে না খাওয়া, সত্যভাষী হওয়া, অপ্রয়োজনীয় কৃপণতা বা অনৈতিক আয় থেকে বিরত থাকা – এই জিনিসগুলো ছাড়লে রিজিকে বরকত আসে।

আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা

তাওয়াক্কুল নিয়ে একটা বড় ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন তাওয়াক্কুল মানে হলো ঘরে বসে থাকা আর আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ্ তা’আলার উপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের যেভাবে রিযিক দেয়া হয় সেভাবে তোমাদেরকেও রিযিক দেয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যা বেলায় ভরা পেটে ফিরে আসে। (তিরমিযী : ২৩৪৪)

পাখির উদাহরণটা খেয়াল করুন। পাখি কিন্তু বসে থাকে না। সে সকালে বের হয়, খাবার খোঁজে, পরিশ্রম করে। কিন্তু এই পরিশ্রমের পাশাপাশি ইখলাসের সাথে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে। ফলাফলের জন্য চিন্তা করে না। আমরা অনেক সময় দুটো ভুলের একটা করি। হয় পরিশ্রম ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর ভার দিই। নয়তো এত বেশি পরিশ্রম করি যে আল্লাহকে ভুলে যাই। দুটোই সঠিক না।

তাওয়াক্কুলের সঠিক পদ্ধতি হলো, পূর্ণ চেষ্টা করা। তারপর ফলাফলটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়া। ব্যর্থ হলে হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করা। কারণ আপনি জানেন, রিজিক আল্লাহ দেন, আপনার চেষ্টা শুধু একটা মাধ্যম।

সিলাতুর রহম (আত্মীয়তার সম্পর্ক) বজায় রাখা

এই আমলটা অনেকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার সাথে রিজিকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে । আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ ‘যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (সহিহ বুখারী : ৫৯৮৫)

অনেক সময় আমরা ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির কারণে আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন রাখি। চাচা-মামা বা দূরের আত্মীয়দের সাথেও কথা কমিয়ে দেই। অথচ ইসলামে বলা হয়েছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে আল্লাহ রিজিকে বরকত দেন। সম্পর্ক কেটে দিলে সেই বরকতের মাধ্যমও বন্ধ হয়ে যায়। অহংকার ত্যাগ করুন, আগে সালাম দিন, ফোন করুন, দেখা করুন। ভুল আপনার না হলেও ছোট হয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আল্লাহর কাছে এই ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না।

দান ও সদকা করা

রিজিক বাড়ানোর আমল হিসেবে সদকা করার দৃশ্য, যেখানে একজন মানুষ অন্যের হাতে সাহায্য তুলে দিচ্ছেন, দান ও সদকার মাধ্যমে রিজিকে বরকত লাভের প্রতীক

সদকা শুধু গরিবকে সাহায্য করার মাধ্যম নয়, এটি রিজিক বাড়ানোর ও আল্লাহর বরকত পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। ছোট থেকে বড় যেকোনো সদকা আল্লাহর নৈকট্য আনতে পারে এবং জীবনের সমস্যা হ্রাস করে। সদকা করলে সম্পদ কমে, এই ভয় শয়তানের দেওয়া। আল্লাহ নিজে বলেছেন:

শয়ত্বান তোমাদেরকে গরীব হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায় এবং লজ্জাকর বিষয়ের নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ নিজ পক্ষ হতে তোমাদের সাথে ক্ষমার ও অনুগ্রহের ওয়াদা করছেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, মহাজ্ঞানী।(সুরা বাকারা : ২৬৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন।”(সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮)

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন:

বল- আমার প্রতিপালকই তাঁর বান্দাহদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছে রিযক প্রশস্ত করেন, আর যার জন্য ইচ্ছে সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু (সৎ কাজে) ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেবেন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রিযকদাতা।(সুরা সাবা : ৩৯)

সদকার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এটা বিপদ দূর করে, রোগ সারায় এবং রিজিকের দরজা খুলে দেয়। হয়তো আপনি ১০০ টাকা সদকা দিলেন, কিন্তু আল্লাহ সেই বিনিময়ে এমন একটা বিপদ সরিয়ে দিলেন যেটায় আপনার লাখ টাকা যেত। এটাই বরকত। সদকা বড় অংকের হতে হয় না। একজন ক্ষুধার্তকে একমুঠো খাবার দেওয়া সদকা, কাউকে একটু সাহায্য করা সদকা, এমনকি মুখে হাসি দিয়ে কথা বলাও সদকা।

আমাদের প্রতিদিন একটি ছোট সদকার নিয়ত রাখা উচিত, পাঁচ টাকা হলেও। কারণ মূল বিষয় পরিমাণ নয়, নিয়মিততা। নবী মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন,

“তোমরা ঠিকভাবে নিষ্ঠাসহ কাজ করে নৈকট্য লাভ কর। জেনে রেখ, তোমাদের কাউকে তার ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাবে না এবং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ’আমল হলো, যা সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয় যদিও তা অল্প হয়।” (সহিহ বুখারি : ৬৪৬৪)

তাই অল্প হলেও নিয়মিত আমল করা এবং প্রতিদিন কিছু সদকা করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

রিজিক বাড়ানোর বিশেষ দোয়াসমূহ

রিজিক বৃদ্ধি ও বরকতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া

নামাজের পর, সকাল-সন্ধ্যায় বা যেকোনো সময় এই দোয়াগুলো পড়তে পারেন। দোয়াগুলো কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া।

দোয়া ১: রিজিকে প্রশস্ততার জন্য

আরবি: اللّٰهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার হালালের মাধ্যমে আমাকে তোমার হারাম হতে বিরত রাখ বা দূরে রাখ এবং তোমার দয়ায় তুমি ব্যতীত অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া হতে আমাকে আত্মনির্ভরশীল কর। (তিরমিযী : ৩৫৬৩)

দোয়া ২: রিজিকে বরকতের জন্য

আরবি: اللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিযকান তাইয়িবা, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালা।

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ্! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিযিক ও এবং কবূল হওয়ার যোগ্য কর্মতৎপরতা প্রার্থনা করি। (ইবনে মাজাহ: ৯২৫)

ফজরের নামাজের পর এই দোয়া পড়া সুন্নত।

দোয়া ৩: দারিদ্র্য ও ঋণ থেকে মুক্তির জন্য

আরবি: اللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসাল, ওয়া আউযুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখল, ওয়া আউযুবিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল।

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রাধান্য থেকে আপনার নিকট পানাহ চাচ্ছি। (সহিহ বুখারি: ২৮৯৩)

শেষ কথা

রিজিক সম্পূর্ণই আল্লাহর হাতে, এটা আমরা সবাই জানি। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য কিছু আমলের দরজা খুলে রেখেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে রিজিকে বরকত আসে। ইস্তিগফার, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং সদকা, এই আমলগুলোই সেই বরকতের চাবি।

সব একসাথে শুরু করা কঠিন মনে হলে সমস্যা নেই। আজ একটি আমল দিয়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে অন্যগুলো যুক্ত করুন। অল্প হলেও নিয়মিত আমলই আল্লাহর কাছে প্রিয়। এক সময় এই আমলগুলো জীবনের অংশ হয়ে যাবে। তখন ইনশাআল্লাহ রিজিকে বরকত আসবে।

আল্লাহ আমাদের সবার রিজিকে বরকত দান করুন, হালাল উপায়ে পরিতুষ্ট রাখুন এবং আখিরাতের কল্যাণকর রিজিকও নসিব করুন। আমিন।  আরও পড়ুন